ঘাটাইলে সম্পদের লোভে স্ত্রীকে খুন: লাশ উত্তোলন করে ময়না তদন্তের দাবী

ঘাটাইল প্রতিনিধি : টাঙ্গাইলের ঘাটাইল পৌর এলাকার গড়জয়নাবাড়ী আব্দুল লতিফ (৪৮) সম্পত্তির লোভে স্ত্রী ফরিদাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সে দেওপাড়া ইউনিয়নের শিবেরপাড়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে। এ বিষয়ে মৃতের চাচা ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের ইমান আলী (৫০) বাদী হয়ে ২৬ জুলাই টাঙ্গাইল জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে ৩ জনের নাম উল্লেখ করে একটি সি আর মামলা দায়ে করেছেন। মামলা নং-৩৩৯/১৮। তাদের দাবী ভাতিজীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে তাই কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, ব্রাহ্মণশাসন গ্রামের মৃত মালেক মাস্টারের একমাত্র কন্যা ফরিদা ইয়াসমিন (৪০) এর সাথে শিবেরপাড়া গ্রামের আবু হানিফের ছেলে আঃ লতিফ ওরফে লেবুর সাথে ১৯৯৪ সালে তাদের বিয়ে হয়। ২৪ বছর দাম্পত্বজীবন পালনকালে তাদের ঘরে দুইটি কন্যা সন্তান জন্ম লাভ করে।

স্বামী আঃ লতিফ নৌবাহিনীতে চাকরী শেষে অবসর নিয়ে স্ত্রী কন্যা নিয়ে গড়জয়নাবাড়ী (ঝড়কা) নিজ বাসায় বসবাস করত।

যে রাতে ফরিদার মৃত্যু হয়

মামলার বিবরণ, পুলিশের সুরত হাল রিপোর্ট, মামলার সাক্ষী হোসেন আলীর জবানবন্দি এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, ১লা জুলাই রবিবার রাতে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বামী আঃ লতিফের ছোট ভাই খাজা মাঈন উদ্দিন (৩৮) ও তার চাচা আঃ কাদের ঐ রাতে গোপনে লতিফের গড়জয়ানাবাড়ী বাসায় অবস্থান নেয় এবং তারা গোপনে বৈঠক করে লতিফকে জমি লিখে না দেওয়া, স্বামীর অবাধ্য হয়ে চলা, ঘুমের ঔষধ সেবন করা সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তারা ফরিদার সাথে কথা শুরু করে। এক পর্যায়ে ঝগড়া বিবাদে পরিণত হয় এবং নির্যাতন করতে থাকে ।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে পাশের বাসার এক গৃহবধু জানায় যখন গভীর রাত, মানুষ ছাড়াও পশু পাখিরাও যখন ঘুমে তখন হঠাৎ করে ফরিদার আকুতি সুরের কান্না, ধস্তাধস্তি ও আত্মচিৎকারের আওয়াজ কানে ভেসে আসে। অল্প কিছুক্ষন পরেই কান্নাকাটির আওয়াজ থেমে যায়। পরের দিন ২জুলাই স্বামী আঃ লতিফ ও তার লোকজন প্রচার করতে থাকে ফরিদা হার্ট এটাক করে মারা গেছে।

তবে বাদী পক্ষের দাবি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঠান্ডা মাথায় ফরিদাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। তার গলার দুই পাশে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। গলার দাগ গোপন করতে সেদিন ফরিদার গলায় মাফলার পেচানো ছিল এবং খুনের ঘটনা লোক চক্ষুর আড়াল করতে সেদিন এলাকাবাসী ও আপনজনকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে ভোর বেলায় কবর কাটা ও সকাল ৯টার আগেই জানাজা সম্পন্ন করে লাশ দাফনের প্রস্তুতি নিলে আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী সন্দেহ হলে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়ে দাফনে বাধা দেয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে লাশ থানায় নিয়ে আসে এবং মর্গে পাঠায়। যারা সেদিন লাশ দেখতে গিয়েছিল তাদের অনেককেই লাশ দেখতে বাধা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি স্বামীর সাথে জমি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবাত মনোমালিন্য ছিল।

যে সব কারণে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ ছিল 
মামলার বিবরণ ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, নিহত ফরিদা ইয়াসমিন বাবা মার একমাত্র সন্তান। বাবা-মার মৃত্যুর পর ফরিদা পৈত্রিক সূত্রে ব্রাহ্মণশাসন, দিগড়, বসুবাড়ী, নজুনবাগ এবং গড়জয়নাবাড়ী ৫ মৌজায় ২টি বাসা সহ মোট ২১২ শতাংশ জমির মালিক হয়। যার আনুমানিক মূল্য ২/৩ কোটি টাকার উর্ধ্বে। লোভী আঃ লতিফ ঐসব জমি তার নামে লিখে দেওয়ার জন্য স্ত্রী ফরিদার উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু ফরিদা রাজী না হওয়ায় এক পর্যায়ে তার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দীর্ঘায়িত হতে থাকে।

এছাড়াও স্বামী লতিফ নৌবাহিনীতে চাকুরী শেষে পেনশনের ১৬ লাখ টাকা ঘাটাইল পোস্ট অফিসে মাসিক মুনাফা হিসেবে স্ত্রী ফরিদার নামে জমা রাখে। বিনিময়ে ৩ কোটি টাকার সম্পত্তি লিখে নেওয়ার জন্য নানান তালবাহানা ও কৌশলের আশ্রয় নেয় কিন্তু ফরিদা স্বামীর দূরভীসন্ধি বুঝতে পেরে জমি লিখে দিতে অস্বীকার করে। এমতাবস্থায় স্বামী আঃ লতিফ ক্ষুদ্ধ হয়ে স্ত্রীর নামের জমা টাকা চাপ প্রয়োগ করে উত্তোলন করে নেয় এবং সেই টাকা নিজের সংসারে খরচ না করে তার বোনের ছেলেকে কানাডা পাঠায়। এই টাকা নিয়েও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ ছিল।

অপরদিকে নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশিদের কাছ থেকে জানা যায়, স্বামী স্ত্রীর জৈবিক চাহিদা নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। তারা একে অপরকে সন্দেহ করত। তাদের সন্দেহের কারনে ফরিদা স্বামীর উপর অভিমান করে ঘুমের ঔষধ সেবন করে। পরে হাসপাতালে ৩ দিন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ১লা জুলাই টাঙ্গাইল থেকে ফরিদা ঝড়কা বাসায় এলে ঐ রাতেই ফরিদার মৃত্যু হয়।

এ বিষয়ে ফরিদার স্বামী আঃ লতিফ ওরফে লেবুর কাছে জানতে চাইলে, তিনি জানান ফরিদা হার্ট এটাক করে মারা গেছে। বাসার কাছেই হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডাক্তার থাকতে কেন তাকে হাসপাতালে নিলেন না উপরন্তু তাকে তড়িঘড়ি করে দাফন করতে ছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার মাথা ঠিক ছিল না তাই ভুল হয়ে গেছে।

ফরিদার মৃত্যুর দিন রাতে কেন ঝড়কা বাসায় গিয়েছিলেন জানতে চাইলে আঃ লতিফ এর ছোট ভাই খাজা মাঈন উদ্দিন কোন সৎ উত্তর দিতে পারেনি।

ফরিদার মৃত্যু হত্যা, আত্মহত্যা না হার্ট এটাকে হয়েছে এ সব বিষয়ে ঘাটাইল থানার অফিসার ইনচার্জ মাকসুদুল আলম এর নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, ময়মাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Related Articles