প্রায় চার কোটি টাকার সার মজুদ না থাকায় টাঙ্গাইলের মধুপুরে বিএডিসি সার গুদাম সিলগালা

সুমন কুমার রায় : গুদামের স্টোর কিপার মারা যাওয়ায় এবং গুদামে বিপুল পরিমান সার মজুদ না থাকার অভিযোগে গত ২১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার কাকরাইদে অবস্থিত বিএডিসির সার গুদাম সিলগালা করে দিয়েছে মধুপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল হক। গত ১৮ এপ্রিল রাত আড়াইটার দিকে গুদামের স্টোর কিপার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করায় গুদামটি সিলগালা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে একটি সূত্র জানিয়েছে গুদাম থেকে প্রায় চার কোটি টাকার সার উধাও হওয়ায় বেকায়দায় পরে কর্তৃপক্ষ। এ কারনে স্টোর কিপার মৃত মোজাম্মেল হকের উপর এসব কিছুর দায়ভার চাপিয়ে দেয়ার পায়তারাও করা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

সরেজমিন মধুপুর বিএডিসি সার গুদাম এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গেইট সিলগালা। পাশেই অফিস কক্ষ তালা দেয়া। গুদামের পাশেই লেবারদের থাকার জায়গা। সেখানে গিয়ে এক লেবারের সাথে কথা হয়। তিনি জানান বর্তমানে গুদামটি সিলগালা হওয়ায় তাদের কোন কাজ নেই। এভাবে চলতে থাকলে তাদের অসুবিধা হয়ে যাবে।
কাকরাইদ এলাকার হুরমুজ আলী নামের এক কৃষক জানান, গুদামটি সিলগালা থাকায় তারাও কোন সার পাচ্ছেন না। এ কারনে তাদের ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই মধুপুর এবং টাঙ্গাইল বেবী স্ট্যান্ডে বিএডিসি সার গুদামের যুগ্ম পরিচালক মোঃ শহিদুল্লাহ শেকের যোগসাজসে অধিক লাভের আশায় ব্যাংক চালান ছাড়াই ডিলারদের কাছে মোটা অংকের টাকা বাকিতে সার বিক্রি করা হয়। আর এই টাকা দীর্ঘ দিন ধরে পরে থাকে ডিলারদের কাছেই। এতে করে কর্তৃপক্ষ ও ডিলাররাই কৃষকদের চাইতে লাভবান হন বেশি।

খোজ নিয়ে জানা যায়, মধুপুর কাকরাইদ বিএডিসির সার গুদামের স্টোর কিপার ১৮ এপ্রিল গভীর রাতে মারা যান। এর পর বেরিয়ে আসে গুদামের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতি। গুদাম থেকে সার বিক্রি দেখালেও সরকারি কোষাগারে প্রায় চার কোটি টাকা জমা পড়েনি। স্টোর কিপার মোজাম্মেল হকের হিসাবের খাতাটাও রয়েছে যুগ্ম পরিচালক মোঃ শহিদুল্লাহ শেখের কাছে বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা। ওই হিসাবের খাতা অনুযায়ি জানা যায়, মধুপুর সার গুদাম থেকে জেলার বিভিন্ন ডিলাররা বাকিতে সার নিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করে স্টোর কিপার মারা যাওয়ায় অধিকাংশ ডিলাররা বাকিতে সার নেয়ার কথা অস্বীকার করছেন। আবার কেউ কেউ বাকি টাকা দেয়ারও আশ্বাস দিচ্ছেন। মধুপুর সার গুদাম থেকে টাঙ্গাইলের হালিম সরকার এন্টার প্রাইজের মোঃ শহিদুর রহমান শহীদের কাছে ৩৫ লাখ টাকা, মনির এন্টার প্রাইজের সত্ত্বাধিকারি রোকনউদ্দিনের কাছে ৪০ লাখ টাকা, মধুপুরের জুয়েল এন্টার প্রাইজের কাছে ৭০ লাখ টাকা, বিএডিসি সার ডিলার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শফিকের কাছে ১৫ লাখ টাকা এবং গোপালপুরের কবির ট্রেডার্সের প্লাবন সহ জেলার আরো বিভিন্ন ডিলারদের কাছে সব মিলিয়ে প্রায় চার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম দূর্নীতি চলতে থাকায় বকেয়া টাকার পরিমান আরো বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ। এ কারনে বেকায়দায় পড়েছে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ। পর্যাপ্ত সার না থাকায় গুদামের দায়িত্ব কেউ বুঝে নিতে চাচ্ছেন না। এতে পর্যাপ্ত সার না পেয়ে কৃষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে।

মনির এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারি রোকন উদ্দিন জানান, তিনি কোন বাকিতে সার আনেননি। তার কাছে কেউ টাকাও পায় না। মেসার্স হালিম সরকার এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারি শহিদুর রহমান শহীদ জানান, যার যার কাছে বাকি ছিল তারা সবাই টাকা দেয়া শুরু করেছেন। তবে তার কাছে ৩৫ লাখ টাকা নয় আরো কম পাওয়া যাবে। এটি হিসাবে ভূল হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
মধুপুর বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, গুদামের সব কিছুর দায়িত্ব স্টোর কিপার মোজ্জামেল হকের। যদি গুদামে সার কম থাকে বা গায়েব হয়ে যায়, সেটা তার দায়িত্ব। তিনি মারা যাওয়ায় জেলা প্রশাসকের নির্দেশে মধুপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) গুদামটি সিলগালা করে দিয়েছেন।

টাঙ্গাইল বিএডিসির যুগ্ম পরিচালক (সার) মোঃ শহিদুল্লাহ শেখ জানান, গুদামের সার গণনার পর জানা যাবে গুদামে সার কম আছে কিনা। তবে স্টোর কিপারের হিসেবের খাতাটা তিনি নেননি। খাতাটা স্টোর কিপার মোজাম্মেল হকের ছেলে কাছে।
মৃত মোজাম্মেল হকের ছেলে মোঃ সোহেল জানান, এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। আমার বাবা একজন সরকারি চাকুরিজীবী। তাদের গুদামের হিসাবের খাতাটাওতো সরকারি। খাতাটি আমাদের পরিবারের কারো কাছেই নেই। খাতাটাতো অফিসেই থাকার কথা।

মধুপুর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাহবুবুল হক জানান, গুদামের কর্তৃপক্ষের কাছে সারের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকাটা পেলেই গুদামটি খুলে দেয়া হবে।

Related Articles