টাঙ্গাইল যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মূরশেদুল করিমের বিরুদ্ধে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর জালিয়াতিসহ বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে টাঙ্গাইল যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি কো- অর্ডিনেটর মো. মূরশেদুল করিমের বিরুদ্ধে। জানা যায়, সে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে অধ্যবধি দায়িত্ব পালন করছেন। গত ৯ বছরে সে ৩৬ টি ব্যাচের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতি ব্যাচ থেকে গড়ে ৩ লাখ টাকা করে সব মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা আত্মাসাত করেছেন তিনি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণের নিয়মাণুযায়ী কোর্সটি সম্পূর্ণ আবাসিক বিধায় কোর্সে ভর্তিকৃতদের হোস্টেলে অবস্থান বাধ্যতামূলক। প্রশিক্ষণ কোর্সটি আবাসিক বিধায় হোস্টেলে অবস্থানকারীদের কেন্দ্রের নিয়মানুসারে প্রশিক্ষণ ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে। আবাসিক হোস্টেলে অবস্থান না করলে ভাতার টাকা প্রদান করা হয় না। সরকারি এই সব নির্দেশনা উপেক্ষা করেই প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতার টাকা দৈনিক ১০০ টাকা খাবারের জন্য দেওয়া হলেও সেখানে তাদেরকে দেওয়া হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা। প্রশিক্ষণের ভাতা বিল কোর্স শেষ হওয়ার ৩ মাস পর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়। আরও জানা যায়, প্রথম সাময়িক ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে নিয়মাণুযায়ী প্রশিক্ষণার্থীকে ড্রপ আউট করার বিধান থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। গত ৯৬ তম ব্যাচে ৭৩ জন ভর্তি হলেও সবাই নিয়মিত হোস্টেলে ছিল না। এদের মধ্যে অনেক প্রশিক্ষণার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল। নিয়মাণুযায়ী পরপর তিন দিন ক্লাস না করলে প্রশিক্ষণার্থীকে বহিস্কার করার বিধান রয়েছে। তারপরেও নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মো. মূরশেদুল করিম প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সকলের টাকাই উত্তোলন করেছেন। সেই সাথে উত্তোলনকারী প্রশিক্ষণার্থী সকলের নামেই সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়। ৯৬ তম ব্যাচের ভাতা বিলের স্বাক্ষরের সাথে প্রশিক্ষণার্থীদের ভর্তি ফর্মের স্বাক্ষরের গড় মিলও পাওয়া গেছে। প্রতিমাসেই প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতির পরিসংখ্যান ও ড্রপআউট এর তালিকা প্রধান কার্যালয়ে প্রেরণ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না।

যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র টাঙ্গাইলে ০৩ (তিন) মাস মেয়াদি ‘গবাদিপশু, হাঁসমুরগি পালন, প্রাথমিক চিকিৎসা, মৎস্য চাষ ও কৃষি বিষয়ক’ প্রশিক্ষণ কোর্সে ৯৬ তম ব্যাচে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১০ মার্চ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ করানো হয়। সেখানে মোট ৭৩ জন ভর্তি হয়। এর মধ্যে আবাসিক হিসেবে মোট ৪০ জন থাকে। বাকী ৩৩ জন অনাবাসিক হিসেবে নিজেদের আবাসস্থল থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ক্লাস করেন। সেখানেও ভাতা বিলে আবাসিক ছাত্রদের হোস্টেলে উপস্থিত অনুসারে টাকার অঙ্ক ও দিনের সংখ্যা না বসিয়েই ফাঁকা ভাতাবিল শীটে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণার্থীদের। অনাবাসিক ছাত্রদের স্বাক্ষর নকল করে টাকা উত্তোলন করা হয়। এখানে অনাবাসিক ছাত্রদের সংখ্যা অনুযায়ি ভাতার পরিমাণ দুই লক্ষ সাতানব্বই হাজার টাকা। শুক্রবার ও শনিবারে আবাসিক ছাত্ররা মাত্র ৪/৫ জন থাকে। যদিও আবাসিক ৪০ জনের সকলেরই নব্বই দিনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। কৌশলে প্রশিক্ষনার্থীদের তিন মাসের স্বাক্ষর একবারে নিয়ে নেওয়া হয়। আবাসিক চালাতে সুদের উপর টাকা নেওয়া হয় এই দোহাই দিয়ে উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রাপ্য (একশত) টাকার ভাতা কমিয়ে জন প্রতি ৮০-৯০ টাকা হারে প্রদান করা হয়। কোন প্রকার ফাইল নোট দেওয়া হয় না। ভাতাবিলে কোর্স কো-অর্ডিনেটর ও মেছ কর্মকর্তা স্যার/ ম্যাডাম বা অন্যান্য স্যারদের স্বাক্ষর নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কখনও তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয় না। কত পরিমাণ টাকা বিল করা হয় সেটাও দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানতে পারেন না। তাদের স্বাক্ষরও নকল করে ট্রেজারিতে বিল জমা দেওয়া হয়। চলতি ৯৯ তম ব্যাচের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, গত ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মো. মূরশেদুল করিমের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ শুনেছেন। তারা সেই অভিযোগের কিছু প্রমাণও পেয়েছেন। বর্তমান ব্যাচে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকলেও আবাসিকে থাকে ৪০ জন। বাকি ৩০ জন তারা তাদের বাড়ি থেকে এসে ক্লাশ করেন। অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা দুপুরে খাওয়ার অনুরোধ করলেও তাতে সাড়া দেওয়া হয়না। চলতি কোর্সে এ পর্যন্ত সাপ্তাহিক ছুটি পেয়েছে ২৪ দিন। সামনে দুর্গা পূজার ছুটিও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রশিক্ষক জানান, স্বাক্ষর জালিয়াতি করে গত ৯ বছরে কোটি টাকার উপরে আত্মসাত করেছেন ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মো. মূরশেদুল করিম। তারই নির্দেশে ট্রেজারির সকল কাজ করেন ক্যাশিয়ার হূমায়ুন কবির অথচ অফিসের প্রধান সহকারী বর্তমান। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়েই হূমায়ুন এই সকল কাজ করেন। ব্যবহারিক ক্লাশের জন্য প্রশিক্ষণ উপকরণের জন্য কোন প্রকার টাকা দেওয়া হয় না। শুধু মাত্র ঔষধ কোম্পানির দুই/তিনটি ক্লাশ ছাড়া বিষয় ভিত্তিক অতিথি বক্তার কোন ক্লাশ হয় না। অনুপস্থিত ছাত্রদের অফিসিয়ালি চূড়ান্ত পরীক্ষার ২/৩ দিন আগে ড্রপআউট দেখিয়ে ভর্তির তারিখ থেকে শুরু করে ৮৬/৮৭ দিনের ভর্তিকৃত সকল ছাত্রের ভাতার টাকা উত্তোলন করা হয়। এছাড়াও কর্মচারীরা তার বাসায় ব্যক্তিগত কাজ না করলে এবং ব্যক্তিগত গরু ছাগল পালন না করলে তাদের ছুটি, বেতন ভাতা আটকিয়ে ব্যাপক ভোগান্তি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং অশ্লিল ভাষায় গালিগালাজ করেন তিনি। এছাড়া কর্মচারীদের শারীরিক নির্যাতনও করা হয়।

শিক্ষার্থীরা আরও জানান, মো. মূরশেদুল করিম ৯ টি ব্যক্তিগত রামছাগল ও ৩ টি ব্যক্তিগত ষাড় গরু প্রশিক্ষণার্থী ও স্টাফ দিয়ে পালন করে যাচ্ছেন। অথচ যেখানে সরকারি গরু মাত্র ১ টি। এর ফলে সরকারি বাগান ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি সাধন হচ্ছে। গরু ছাগলের খাবার এদিক সেদিক হলে শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের সাথে খারাপ আচরণ করেন তিনি। ঈদুল আযাহার সময় তিনি তার ব্যক্তিগত ৪ টি রামছাগল বিক্রি করেছেন। প্রতি ব্যাচে জামানতের ফেরতযোগ্য ১০০ টাকা ঠিকমতো দেওয়া হয় না, এটাও লক্ষ টাকা পেরিয়ে গেছে বলে জানা যায়। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নৈশ প্রহরী মো. শাহিনকে মাশুআরার বিনিময়ে দিনের বেলায় প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যত্র কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সে রাতের বেলায় নৈশ প্রহরীর দায়িত্ব পালন না করে বাসায় এসে ঘুমায়। ফলে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নিরাপত্তাহীতায় থাকে।

এসকল বিষয়ে টাঙ্গাইল যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি কো- অর্ডিনেটর মো. মূরশেদুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোন প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

Related Articles