এনআরসি ইস্যুতে বেকায়দায় বিজেপি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতজুড়ে জাতীয় নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসির ঘোষণা দিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। কী করবে, কী বলবে সেটা নিয়ে ধন্দে পড়েছেন দলটির নেতারা। গোটা দেশজুড়ে এনআরসি হবে বলে এর আগেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পার্লামেন্টে ঘোষণা করেছেন। অথচ রবিবার দিল্লিতে এক জনসভায় নরেন্দ্র মোদি বলেন তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এনআরসি নিয়ে কখনোই নাকি কোনো চর্চা ছিল না, কেবল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তারা আসামে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাধ্য হয়েছেন।

সরকারের কাছ থেকে এধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আসার পর পর্যবেক্ষকদের ধারণা দেশব্যাপী বিক্ষোভের মুখে সরকার আসলে এনআরসি প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করতে চায়। আর সোমবার ঝাড়খন্ডে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়ও এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে।

আসলে ভারত সরকার সারা দেশজুড়ে নাগরিকদের তালিকা তৈরির অভিযান নিয়ে অগ্রসর হবে কি না, রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভাষণের পর থেকেই তা নিয়ে আবারো চরম বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদি সেখানে দাবি করেন, ‘২০১৪ সালে আমার সরকার ক্ষমতায় আসার পর এনআরসি নিয়ে কোনো চর্চাই ছিল না, কোনো কথাও হয়নি। শুধু যখন সুপ্রিম কোর্ট বলল, তখনই সরকারকে শুধু আসামে এটা করতে হয়েছে।’

কিন্তু মাত্র মাসখানেক আগেই পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এনআরসি নিয়ে ঠিক এর উল্টো সুরে কথা বলেছিলেন। অমিত শাহ তখন বলেন, ‘এনআরসি প্রক্রিয়া শুধু সারা দেশেই হবে না – এমনকি আসামেও তা নতুন করে করা হবে।’

তার যুক্তি ছিল, দেশের নিরাপত্তার স্বার্থেই বৈধ নাগরিকদের তালিকা প্রস্তুত করা ও অবৈধদের চিহ্নিত করা খুব জরুরি।

কিন্তু বিরোধী নেতারা এখন প্রশ্ন তুলছেন, দেশবাসী তাহলে কার কথা বিশ্বাস করবে – মোদি না অমিত শাহ?

সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি যেমন বলছেন, ‘নাগরিকত্ব আইন আর এনআরসি যে যমজ সন্তান, একটার সঙ্গেই আরেকটা আসবে – অমিত শাহ কিন্তু আগাগোড়া এই প্যাকেজ আকারেই জিনিসটা বিক্রি করে এসেছেন।’

‘আর প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য আর পার্লামেন্টে অমিত শাহর ঘোষণা দুটো তো একসঙ্গে ঠিক হতে পারে না – কোনটা ঠিক তারা বলুন।’

‘আর এনআরসি যদি না-ই করবেন, খোলাখুলি সেটা দেশকে বলুন – সেটাও তো আপনারা বলছেন না!’

দেশব্যাপী এনআরসি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকেই খণ্ডন করছেন, টুইট করে তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও।  আর মোদি ও অমিত শাহের বক্তব্যের ফারাক ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন বিজেপি নেতারাও।

বিজেপি এমপি রাকেশ সিনহা যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, ‘লোকে এমনভাবে এনআরসিকে আক্রমণ করছে যেন এটা কোনো ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ। দেশের নাগরিকদের তালিকা করায় অপরাধটা কোথায়?’

‘আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো এনআরসি করার কোনো সময়সূচি ঘোষণা করেননি, চার্টারও বেঁধে দেননি।’

‘আর প্রধানমন্ত্রী বলছেন এখন এনআরসি হবে না, ব্যাস এইটুকুই!’, বেশ দুর্বলই শোনায় তার সাফাই।

দিল্লির জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিরোধীরাও সাময়িক কালক্ষেপণের কৌশল হিসেবেই দেখছেন – ভারতব্যাপী এনআরসি শিকেয় তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা হিসেবে নয়।

তারা মনে করছেন, এদিন ঝাড়খন্ড রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয়ও সম্ভবত এনআরসিকে আরও পিছিয়ে দেবে – কিন্তু বিজেপির রোডম্যাপ থেকে মুছে দেবে না।

দিল্লির যন্তর মন্তরে এদিন এক প্রতিবাদসভায় বামপন্থী রাজনীতিক বৃন্দা কারাট বলছিলেন, ‘এবছরের জুলাইতেই সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা করা হয়েছে ২০২০-র ১ এপ্রিল থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে জাতীয় আদমশুমারি বা এনপিআর তৈরির কাজ শুরু হয়ে যাবে – আর তার ভিত্তিতেই তৈরি হবে এনআরসি। তাহলে প্রধানমন্ত্রী কাকে ধোঁকা দিচ্ছেন?’ প্রশ্ন মিস কারাটের।

ভারতে পর্যবেক্ষকরাও তাই মনে করছেন, সারা দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে এনআরসি নিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকার এখন একটা ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়ে এগোতে চাইছে – আর সে কারণেই সৃষ্টি করা হয়েছে এই পরিকল্পিত বিভ্রান্তি।  সূত্র: বিবিসি বাংলা

(এম কন্ঠ/আর.কে/২৪ডিসেম্বর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

 

Related Articles