যে মসজিদে ৯১বছর ধরে ২৪ ঘন্টাই চলছে কোরআন তেলাওয়াত!

ধনবাড়ী প্রতিনিধি :

ইবাদতের পবিত্র স্থান মসজিদ। মসজিদে মুসুল্লীরা পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করবেন এটাই স্বাভাবিক। নফল ইবাদত হিসেবে কোরআনা তেলাওয়াত করবেন এটাও ব্যতিক্রম কিছুনা। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী ৭শ’ বছরের পুরোনো নওয়াব শাহী জামে মসজিদে ১৯২৯ সালে নবাবের মৃত্যুর পর থেকে ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে। সুদীর্ঘ সময়ে কখনও বন্ধ হয়নি কুরআন তেলাওয়াত। মসজিদের ভেতর পালাক্রমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হাফেজরা কোরআন তেলাওয়াত করছেন।

মসজিদের খতিব ও ইমাম হাফেজ মাওলানা ইদ্রিস হুসাইন বলেন, পীরের নিদের্শনায় কবরের আজাব থেকে মুক্তি পেতে ১৯২৭ সালে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এ মসজিদে সার্বক্ষণিক কোরআন তেলাওয়াত করার ব্যবস্থা করেন। ১৯২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। মসজিদের একপাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তার মৃত্যুর পরও চলমান রয়েছে কোরআন তেলাওয়াত। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে, নামাজের সময় ছাড়া এক মিনিটের জন্যও বন্ধ হয়না কোরআন তেলাওয়াত। টানা ৯১ বছর ধরে অবিরত চলছে কোরআন তেলাওয়াত।

বর্তমানে মসজিদটিতে সাতজন হাফেজে-কারি নিযুক্ত রয়েছেন। তারা প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর একেকজন কোরআন তিলাওয়াত করে থাকেন। এটি বিশ্বের বুকেও একটি বিরল ঘটনা।

ইতিহাস বলছে, সেলজুক তুর্কি বংশের ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ নামে দুই ভাই ১৬ শতাব্দীতে ঐতিহ্যবাহী এক কক্ষ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। সম্রাট আকবরের সময় এই দুই ভাই ধনবাড়ীর অত্যাচারী জমিদারকে পরাজিত করার পর এ অঞ্চলের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী প্রায় ১১৫ বছর আগে এ মসজিদটি সম্প্রসারণ করে আধুনিক রূপ দেন। তিনি বাংলাভাষার প্রথম প্রস্তাবক, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও যুক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

সংস্কারের আগে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল ১৩.৭২ মিটার (৪৫ ফুট)। প্রস্থ ছিল ৪.৫৭ মিটার (১৫ ফুট)। সংস্কার করে মসজিদটি বর্গাকৃতির ও তিনগম্বুজ বিশিষ্ট মুঘল স্থাপত্যের বৈসাদৃশ্যপূর্ণ করা হয়েছে। মোগল স্থাপত্য-রীতিতে তৈরি এই মসজিদের মেঝে আর দেয়াল কাঁচের টুকরো দিয়ে নকশাদার মোজাইক করা। মেঝেতে মার্বেল পাথরে খোদাই করা নিপুণ কারুকার্য অসাধারণ। ভেতরের সব জায়গাতেই চীনামাটির টুকরো দ্বারা মোজাইক নকশায় অলংকৃত, যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফুলের নকশা দৃশ্যমান। এত বছরে একটু ফাটল পর্যন্ত ধরেনি সেই নকশায়। সংস্কারের কারণে প্রাচীনত্ব কিছুটা বিলীন হলেও মসজিদের সৌন্দর্য-শোভা অনেক বেড়েছে।

মসজিদের ভেতরে ঢোকার জন্য পূর্বদিকের বহু খাঁজে চিত্রিত খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ, উত্তর ও দক্ষিণে আরো একটি করে সর্বমোট পাঁচটি প্রবেশ পথ রয়েছে। প্রায় ১০ কাঠা জায়গায় নির্মিত মসজিদটির চর্তুদিক থেকে ৪টি প্রবেশ পথ এবং ৯টি জানালা এবং ৩৪টি ছোট ও বড় গম্বুজ রয়েছে। বড় ১০টি মিনারের প্রত্যেকটির উচ্চতা ছাদ থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু।

মসজিদের দোতলার মিনারটির উচ্চতা প্রায় ১৫ ফুট। ৫ ফুট উচ্চতা এবং ৩ ফুট প্রস্থের মিহরাবটি দেখতে বেশ আকর্ষণীয় এবং দৃষ্টিনন্দন। মসজিদের মেঝে ও দেয়াল কাঁচের টুকরো দিয়ে নকশা ও মোজাইক করা। ভেতরের পুরো অংশ জুড়ে চীনা মাটির টুকরো দিয়ে অধিকাংশ স্থানে ফুলের নকশা করা হয়েছে।

৩০ ফুট উচ্চতার মিনারের মাথায় স্থাপিত ১০টি তামার চাঁদ মিনারের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। মসজিদে ১৮টি হাড়িবাতি সংরক্ষিত রয়েছে, যেগুলো শুরুর যুগে নারিকেল তেলের মাধ্যমে আলো জ্বালানোর কাজে ব্যবহার করা হতো। মুঘল আমলে ব্যবহৃত ৩টি ঝাড়বাতিও রয়েছে। সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে একসঙ্গে ২০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদের পাশেই রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট ও কবরস্থান। যেখানে দাফন করা হয়েছে নওয়াব বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীকে। তার ওয়াকফকৃত সম্পদের মাধ্যমে মসজিদ, পার্শ্ববর্তী মাদ্রাসা ও ঈদগাহ পরিচালিত হয়।

পূর্বদিকের ৩টি প্রবেশপথ বরাবর পশ্চিমের দেয়ালে ৩টি মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটির অষ্টভুজাকারের, দুই পাশে রয়েছে বহু খাঁজবিশিষ্ট খিলান। তাছাড়াও সেটিতে ফুলের রকমারি নকশা রয়েছে। অন্য দু’টি মিহরাবও বহু খাঁজবিশিষ্ট তবে কারুকার্যহীন খিলানযোগে গঠিত। প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর শান বাঁধানো ঘাটের বিশাল একটি দীঘি রয়েছে। তাতে মুসল্লিরা অজু করেন। তাছাড়াও মসজিদের আশপাশে সুপ্রশস্থ ও খোলামেলা অনেক জায়গা রয়েছে। যা দর্শনার্থীদের মনে বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

কিন্তু বর্তমানে ময়লা-আবর্জনায় ঐতিহ্য হারাচ্ছে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী নওয়াব বাড়ির ঐতিহ্যবাহী দীঘিটি। শতাধিক বছরের পুরনো এ দীঘির পাড়ে নির্মিত বসতবাড়ির নিত্য ব্যবহার্য আবর্জনা ফেলে ও পয়ঃনিষ্কাশনের পাইপ লাইনের নোংরা পানিতে দূষিত হচ্ছে পানি। ফলে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এটি। ভরাট হয়ে যাচ্ছে দীঘির তলদেশও। একসময় এতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হতো, চলতো মাছ ধরার প্রতিযোগিতা। এখন আর আগের মতো মাছ চাষ হয় না। ধনবাড়ীর নওয়াব বাড়ির এই দীঘি উত্তর টাঙ্গাইলের সবচেয়ে বড় দীঘি। শুষ্ক মৌসুমে সব পুকুরের পানি শুকিয়ে গেলেও এ দীঘির পানি স্থির থাকে।

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি নওয়াব শাহী জামে মসজিদটি দেখতে , কোরআন তেলাওয়াত শুনতে ও নামাজ পড়তে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আসেন। এলাকার জনগণের ঐতিহ্য ও কালের সাক্ষী হিসাবে টিকে থাকা এ মসজিদটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসাবে ঘোষণা করে সরকার মসজিদটির সংস্কার করুক এমনটিই প্রত্যাশা এলাকাবাসীর।

(এম কন্ঠ/আর.কে/২৫ডিসেম্বর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles