বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা

রেজাউল করিম :
বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা নয়মাস রক্তঝরা যুদ্ধের পর ৭১ ১৬ ডিসেম্বরে নিশ্চিত হয় আমাদের বিজয় মাসটি এলেই বাঙ্গালী জাতি স্মরণ করে সেইসব অকুতভয় যোদ্ধাদের যাদের সাহসিকতা আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাঙ্গালি পেয়েছে স্বাধীন জাতি, সার্বভৌমত্ব একটি দেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি উদযাপন করেছে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারিবেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ৩১বার তোপধ্বনি, শহীদদের স্মরণে পুস্পস্তপক অর্পণ রুহের মাগফেরাত কামনা, মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ, প্রীতি টি২০ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা সভা, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের সংর্বধনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মোনাজাত প্রার্থনা, জেলখানা, হাসপাতাল, এতিমখানা, সরকারি শিশু পরিবার (বালক বালিকা) এবং নারী পূনর্বাসন কেন্দ্র সমুহে উন্নত খাবার পরিবেশন, প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামন্য চলচিত্র প্রদর্শণ এবং আলোচনাসভা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়

টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন ১১ নং সেক্টরে টাঙ্গাইলে ছিলো বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীরকাদেরিয়া বাহিনী খন্দকার আব্দুল বাতেনেরবাতেন বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী খেতাবপ্রাপ্ত বীরমুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছয়শ৭৬ জন তার মধ্যে ৭জন রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব, ৬৮জন বীরউত্তম, একশ৭৫জন বীরবিক্রম চারশ২৬জনকে বীর প্রতীক এই ৬শ৭৬ জন খেতাবী বীরমুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বীরমুক্তিযোদ্ধা ছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুরের শহিদুল ইসলাম লালু তিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে স্বাধনীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখে বীরপ্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আব্দুল খালেক, আব্দুল মজিদ, মজিবর রহমান নামে তিন মুক্তিযোদ্ধা যাদের একটি আলোচিত ছবি আজ দেশের ঘরে ঘরে জেলার বাসাইলে রয়েছে নুরে আলম তালুকদার রবি প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণে তার রয়েছে আলোচিত আরেকটি ছবি ওরা পাঁচজনই বঙ্গবন্ধুর দেয়া মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এদের ছাড়াও জেলার অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেয় স্বাধীনতা যুদ্ধে

ছবির মুক্তিযোদ্ধা খালেক,মজিদ মজিবরের বাড়ি দেলদুয়ার উপজেলার এলাসিন ইউনিয়নের মুশুরিয়া গ্রামে ওপরে গ্রেনেড ছুড়ছেন কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক মাঝে রাইফেল হাতে আব্দুল মজিদ বামে মজিবর রহমান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের প্রত্যক্ষ সাক্ষী আলোচিত ছবিটি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর গোধূলিলগ্নে ময়মনসিংহের সম্ভুগঞ্জে পাকসেনাদের একটি শক্ত ঘাটির ভাংকার ধ্বংসের চিত্রটি ক্যামেরা বন্ধি করেন মানিকগঞ্জের নাইব উদ্দিন নামের এক ফটোগ্রাফার মুক্তিযুদ্ধে এই তিন বীরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লেও ১৯৭২ সালের জানুয়ারি একটি দৈনিকে ছবিটি প্রকাশের পর জানা যায় ওরা বেঁচে আছেন আব্দুল খালেক মুশুরিয়া গ্রামের মৃত হযরত আলী রুপজানের ছেলে মজিবর রহমান ওই গ্রামের মৃত মনসের আলুী মৃত সখিনা বেগমের সন্তান আব্দুল মজিদও একই গ্রামের মৃত সলিম উদ্দিন সোনাবানুর সন্তান
আব্দুল খালেক জানান, তারা তিন বন্ধুই তখন ১৩/১৪বছরের কিশোর ১৯৭১ সালের মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে প্রেরণা পেয়ে যুদ্ধে নামেন প্রথমে মনে করেন সেনাবাহিনীই পারবে দেশকে মুক্ত করতে অনিশ্চয়তা দেখে সমবয়সীদের সংঘবদ্ধ করতে থাকে মে শেষের দিকে ওরা ২১ জন বন্ধু মিলে নৌকা যোগে ইন্ডিয়ার মাইনকার চরে যান তিনদিন পর তাদের মেডিকেল হয় তুরা ক্যাম্পে শুরু হয় প্রশিক্ষণ সেখানে আলফা কোম্পানীর নিয়ন্ত্রনে ২১ দিন ফ্রন্টফাইটার অতঃপর ৭দিন গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৭শপ্রশিক্ষিত যোদ্ধা দেশে ফেরে ওদের কৌশল ছিল, সুযোগ বুঝে শত্রæদের ওপর আকস্মিক হামলা, পরক্ষণেই ইন্ডিয়াতে আত্মগোপন করা কিছুদিন পর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ৭১ ৪ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী (ইন্ডিয়ান আর্মি বিহার) রেজিমেন্টের সাথে সরাসরি যুদ্ধে নামেন পাক সেনাদের ওপর গুলির পাশাপাশি ধ্বংস করেন শত্রæদের বেশ কয়েকটি ঘাটি

গোপালপুর পৌর শহরের সূতীপলাশ পাড়া গ্রামের মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আমিনা বেগমের ছেলে শহিদুল ইসলাম লালু। ছোটবেলা থেকেই দুরন্ত প্রকৃতির ছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গোপালপুরে পাকহানাদার বাহিনীর ফায়ারিং শুরু হলে স্থানীয়রা এলাকা ছাড়তে শুরু করে। লালুও সাথে যায়। লালুর সাথে ধনবাড়ীর কেরামজানী স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের চাপানি খাওয়ানোর পাশাপাশি মাঝে মধ্যে অস্ত্র পরিস্কারের কাজ করতেন। এভাবেই অস্ত্র ধরা শেখেন কিশোর লালু। ভারতে গিয়ে স্ট্রেনগান গ্রেনেড পান। আর পোশাক হিসেবে হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি মাথার ক্যাপ। ভারতের তুরা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণকালে ব্রিগেডিয়ার সামসিং শহিদুল ইসলামের নামের সাথে লালু নামটি যুক্ত করেন। সেই থেকে শহিদুল ইসলামের নাম হয়ে যায় শহিদুল ইসলাম লালু। লালু স্ট্রেনগান গ্রেনেড বিষয়ে ভালো শিক্ষা চলে আসেন গোপালপুরের কেরামজানীতে। শহিদুল ইসলাম লালুকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো গোপালপুর থানার পাক হানাদার বাংকার গ্রেনেড মেরে উড়িয়ে দেওয়ার। লালু হাফপ্যান্ট পরে বিকেল বেলা তিনটি গ্রেনেড নিয়ে গোপালপুর থানার সামনে যেতেই পরিচিতদের সাথে দেখা। পরিচিতদের সাথে রাজাকার ছিল। কোথায় ছিলি লালুকে জিজ্ঞেস করলো ? চারদিকে শুধু গোলাগুলি ! আমার ভয় লাগে তাই নানা বাড়ী গিয়ে ছিলাম। তুই আমাদের ক্যাম্পে থেকে যা, বাংকারে পাঞ্জাবী সেনাদের চাটা খাওয়াবি। প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় লালু। গ্রেনেড তিনটি থানার পেছনের পুকুর পাড়ে রেখে ক্যাম্পে প্রবেশ করে। সবার অগোচরে থানার ভেতরের পরিত্যক্ত গ্রেনেড তিনটি রেখে তা ব্যবহারের সময় খুঁজতে থাকে। লালু ছোট হওয়ায় সহজেই লুকিয়ে রাখা গ্রেনেডগুলো আনেন। গ্রেনেড গুলোর সেফটিপিন খুলে দ্রæ প্রত্যেক বাংকারের দিকে ছুড়ে মারেন। এতে তিনটি বাংকারের সবাই মারা যায়। আর সে দিনই মুক্তিযোদ্ধারা গোপালপুর থানা সহজেই দখল করে নেয়। শহিদুল ইসলাম লালু গোপালপুর, ভূঞাপুর, মধুপুর নাগরপুরের কয়েকটি রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন। আর অধিকাংশ সময়ে পাক বাহিনীর নজরদারির কাজটি করতেন। ছদ্মবেশ ধরে অগ্রিম খবর আনতে শহিদুল ইসলাম লালুর প্রশংসা ছিলো। অনেক সময় লালুর খবরের উপর ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা পরবর্তী পরিকল্পনা করতো। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে যখন টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট কাদেরিয়া বাহিনীর সকল মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, তখন শহীদুল ইসলাম লালুও তার ব্যবহৃত স্ট্রেনগানটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দেন। বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে শহিদুল ইসলাম লালুর পিঠ থাপড়ে বলে ছিলেন সাব্বাস। যখন সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে লালুর বাংকার ধ্বংসের কথা শুনলেন তখন বঙ্গবন্ধু তাকে আদর করে কোলে নিয়ে বলেছিলেনবীর বিচ্ছু। শহিদুল ইসলাম লালু সশস্ত্র বাহিনী দিবস ২০০০, আজীবন সংবর্ধনা ২০০৩, শেখ হাসিনা খালেদা জিয়া কর্তৃক পুরস্কার অর্থিক অনুদান, মিশরের রাষ্ট্রদূত কর্তৃক পুরস্কার সহ আরো অনেক খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বীর বিচ্ছু দেশের সর্ব কনিষ্ঠ বীরপ্রতীক শহিদুল ইসলাম লালু ২০০৯ সালের ২৫ মে ঢাকাস্থ মিরপুরে বাস ভবনে মারা যান। মিরপুরেই সমাহীত হন তিনি

এদিকে আলোচিত মুক্তিযোদ্ধা নুরে আলম বাসাইল উপজেলার ফুলকী ইউনিয়নে জশিহাটী গ্রামের মৃত ইউসুফ তালুকদারের ছেলে নুরে আলমও শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনে যুদ্ধে যেতে অনুপ্রানিত হয় কমান্ডার সাইদুর রহমান বীরপ্রতিকের হাত ধরে যোগ দেন কাদেরিয়া বাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান ভারতের মেঘালয়ে ১৬ বছর বয়সী নুরে আলম দেড়মাস প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিদ্ধে বিশেষ অবদান রাখেন
নুরে আলম বলেন, ৭১ এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি কিন্তু মুজিব ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি কমান্ডার সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে জেলার কালিহাতী থেকে নৌকা নিয়ে দেড় শতাধিক মুক্তি বাহিনী প্রশিক্ষণ নিতে ভারতের মেঘালয়ে যাচ্ছিলেন সাথে ছিলেন প্রায় সাড়ে ৩শ শ্বরনার্থী রংপুরে আরেক দল মুক্তিবাহিনীর সাথে দেখা তিনি তখনছোটদেরবড়দের, সকলের গরীবেরনিঃস্বেরফকিরে আমার এদেশ সকলেরদেশাত্ববোধক এই গানটি গাইছিলেন মুক্তিবাহিনীর ওই দল চিনতে না পেরে তাদের উপর আক্রমন করার প্রস্তুতি নেয় এমন সময় ওই দলের কমান্ডার বাংলা গানের শব্দ পেয়ে বলেছিল, নৌকায় গান গাইলো কে? তখন আলম এগিয়ে গেলেন ওই কমান্ডার বললো তোর কারণে আজ সবাই বেঁচে গেলো মেঘালয়ে প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সদস্য হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকবাহিনীর ওপর জেলার কাগমারী এলাকায় পত্যক্ষ যুদ্ধে ক্যামেরাবন্দি হয়
বাসাইল উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুরুল ইসলাম জানান, নুর আলম একজন সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধা ওই ছবিটিও নুর আলমের দাবি করে বলেন, ছবিটি আমাদের বাসাইলের গর্ব এই ছবিকে সংরক্ষণ ছবির ওপর ভিত্তি করে একটি ভাস্কর্য তৈরির জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান তিনি

জেলার তিন উপজেলার এই আলোচিত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি দিয়ে একটি করে ভাস্কর্য তৈরি করে তাদের স্মরণীয় রাখার দাবি এলাকাবাসীর

 (এম.কন্ঠ/২২ডিসেম্বর/আর.কে)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles