প্রথম পর্বের ইজতেমা শেষ; দ্বিতীয় পর্ব ১৭ জানুয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক :

দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি এবং দেশ ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাবলিগ জামাতের ৫৫তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। এ সময় টঙ্গীর ‘কহর দরিয়া’ খ্যাত তুরাগ নদীর তীরে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ক্ষণে ক্ষণে ‘আল্লাহুম্মা আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়।

মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশের তাবলিগের প্রধান মারকাজ কাকরাইলের মুরব্বি হাফেজ মাওলানা জোবায়ের আহমদ। এর আগে ফজর নামাজের পর থেকে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আব্দুর রহমান ও হেদায়েতের বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা জিয়াউল হাসান এবং ওলামাদের বয়ান করেন ভারতের ইব্রাহিম দেওলা।

আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো আলমি শূরা অর্থাৎ শুরায়ে নেজামপন্থীদের তিন দিনের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। চার দিন বিরতির পর আগামী ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় পর্ব, অর্থাৎ সাদপন্থীদের ইজতেমা। এ পর্বেও অংশ নেবেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিসহ ৬৪ জেলার মুসল্লিরা।

প্রথম পর্বে বিশ্বের ৫১টি দেশের দুই সহস্রাধিক মেহমানসহ প্রায় ৩০ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ দশ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মুঠোফোন ও স্যাটেলাইট টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুবাদে দেশ-বিদেশের আরও লাখ লাখ মানুষ একসঙ্গে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে।

রবিবার সকালে দিকনির্দেশনামূলক বয়ানের পর লাখ লাখ মানুষের প্রতীক্ষার অবসান ঘটে বেলা ১১টা ৮ মিনিটে। জনসমুদ্রে হঠাৎ নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। যে যেখানে ছিলেন সেখানে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে হাত তোলেন আল্লাহর দরবারে। ইজতেমামুখী মানুষ বিমানবন্দর গোল চত্বর কিংবা উত্তরা থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন। কান্নায় বুক ভাসান মুসল্লিরা।

৩৮ মিনিট ধরে চলা মোনাজাতে মাওলানা জোবায়ের আহমেদ প্রথম ১৮ মিনিট পবিত্র কোরআনে বর্ণিত দোয়ার আয়াতগুলো উচ্চারণ করেন। শেষ ২০ মিনিট দোয়া করেন বাংলা ভাষায়।

এদিন ভোর থেকে রাজধানী, গাজীপুর, নরসিংদী, সাভারসহ টঙ্গীর চারপাশের এলাকার মুসল্লিদের গন্তব্য ছিল টঙ্গীর তুরাগ তীর। যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল বলে হাজার হাজার মানুষ সড়ক ও রেলপথ ধরে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যান। সকাল ৯টার আগেই ইজতেমা মাঠ ও আশপাশ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

মুসল্লিরা আশপাশের এলাকার বাসাবাড়ি, কলকারখানা-অফিস ও দোকানের ছাদে, যানবাহনের ছাদে ও তুরাগ নদেতে নৌকায় অবস্থান নেন। যেদিকে চোখ যায়, শুধু টুপি-পাঞ্জাবি পরা মানুষ। ইজতেমাস্থলের চারপাশের ৩-৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

ইজতেমাস্থলে পৌঁছাতে না পেরে কয়েক লাখ মানুষ কামারপাড়া সড়ক ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, খিলক্ষেত-বিমানবন্দরে অবস্থান নেন। সেখান থেকেই অংশ নেন মোনাজাতে।

উপস্থিত মুসল্লিরা জানান, এ যেন এক নতুন নজির। বিগত এক যুগেও এত বেশি মুসল্লির সমাগম দেখা যায়নি বিশ্ব ইজতেমায়।

বিশ্বমুসলিম উম্মার হেফাজত, ইমান, আখলাক, আমল ও হেদায়েতের দোয়া করা হয় মোনাজাতে। আল্লাহর কাছে আকুতি জানিয়ে মোনাজাতে মাওলানা জোবায়ের বলেন, ‘হে আল্লাহ, ইজতেমায় শরিক সকল মুসল্লির গোনাহ মাফ করে দেন, সকল মুসলিমের মোনাজাত কবুল করে নেন। হে আল্লাহ, আমাদের আখেরাতের দিন সকল গোনাহ ক্ষমা ও সহজ করে দেন। হে আল্লাহ, আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দেন, আমাদের সবার মাঝে মানবতা বৃদ্ধি করে দেন। হে আল্লাহ, আমাদের আখলাক হেফাজত করার তৌফিক দান করেন। হে আল্লাহ, শয়তানের ধোঁকা থেকে আমাদের হেফাজত করেন। হে আল্লাহ, আমাদের নবীর সাফায়াত নসিব করেন। হে আল্লাহ, আপনি এই ইজতেমাকে কবুল করেন।’

মোনাজাত চলাকালে পুরো ইজতেমা ময়দান ও আশপাশের এলাকায় পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর পর আমিন-আমিন, ছুম্মা আমিনমিন-আল্লাহুম্ম আমিন ধ্বনিতে মুখরিত হয় ইজতেমা ময়দানসহ পুরো টঙ্গী শিল্পনগরী।

মোনাজাতে ভিআইপিদের অংশগ্রহণ

প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে গণভবন থেকে সরাসরি মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোনাজাতে শরিক হন ছোট বোন শেখ রেহানা, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কমকর্তারা। এছাড়া টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে মোনাজাতে অংশ নেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি ষ্পিকার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি মিয়া, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আজমত উল্লা খান, সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক এস এম তরিকুল ইসলাম, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. আনোয়ার হোসেনসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

মোনাজাত প্রচারের ব্যবস্থা

মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। ইজতেমার ময়দানের বাইরে অবস্থানকারী মুসল্লি ও পথচারীদের মোনাজাতে শরিক হতে ইজতেমা ময়দানের বাইরে আশপাশের এলাকায় শতাধিক মাইকের সংযোগ দেয়া হয়।

মোনাজাত অংশগ্রহণের সুবিধার্থে ১৬টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করে অন্তত ১০ হাজার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।

বাড়ি ফিরতে মুসল্লিদের দূর্ভোগ

আখেরি মোনাজাত শেষে বাড়ি ফেরা মুসল্লিদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সড়কে তীব্র যানজট, অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া, ট্রেন ও বাসে স্থান সংকুলান না হওয়ায় মুসল্লিরা দুর্ভোগে পড়েন। রাজধানী ও গাজীপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে আগত মুসল্লিরা পরিবহন না পেয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা দেন।

আরও পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু

বিশ্ব ইজতেমায় প্রথম পর্বে আরও ৫ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, শেরপুরের আব্দুল কাইয়ুম (৬৫), কিশোরগঞ্জের নূরুল ইসলাম (৬০), কক্সবাজারের আলী আহমেদ (৬১) ও জয়পুরহাটের আব্দুল মমিনসহ (৫৫) ও গাজীপুরের গাছা এলাকার মাদ্রাসাছাত্র মাজহারুল ইসলাম (১৬)। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে আসার পথে কলেজ গেইট এলাকায় সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যায়  মাজহারুল। এ নিয়ে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বে ১৪ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে।

ইজতেমা ময়দানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সহ-প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান জানান, দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমার জন্য ময়দান প্রস্তুতির কাজ সোমবার সকালে শুরু হবে। পুরো ময়দানের  আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ওজু, গোসলখানা ও টয়লেটগুলো পরিষ্কার করতে কর্মীরা প্রস্তুত আছেন। দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা ১৭ জানুয়ারি শুরু হবে।

(এম কন্ঠ/আর.কে১২জানুয়ারি )

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles