ভাষা সৈনিক হযরত আলী রা এখনও অপরিচিত

মো. সেলিম হোসেন:

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন বায়ান্নর ভাষা সৈনিক হযরত আলী। যাঁরা মায়ের ভাষায় কথা বলার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে বিন্দু মাত্র কৃপণতা করেননি। বুকের তাঁজা রক্তে রাজপথ রাঙিয়ে দিয়ে আমাদের জন্য বাংলা ভাষায় কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন, তাঁদের একজন গোপালপুর উপজেলার নবগ্রামের মৃত রোস্তম আলীর ছেলে এই ভাষা সৈনিক।

একুশে ফেব্রুয়ারি আমরা খালি পায়ে প্রভাত ফেরির মাধ্যমে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করি। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হযরত আলীদের মতো ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয় স্মরণিকায় নাম না থাকায় তাঁরা এ প্রজন্মে অপরিচিত।

ভাষা সৈনিক আলহাজ্জ হযরত আলী জানান, ভাষা আন্দোলনের ঢেউ ঢাকা ছাড়িয়ে যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সারা দেশের ন্যায় গোপালপুর উপজেলায় মিটিং করে গান গেয়ে ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করা হয়। সে সময় হযরত আলী স্থানীয় সূতী ভি এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ও ক্লাস ক্যাপ্টেন। যেদিন ১৪৪ ধারা জারি করা হয়, সেদিন একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহিমের নেতৃত্বে মিছিল করতে গিয়ে তিনিসহ গ্রেফতার হন আব্দুর রহিম ও সহপাঠি মহেন্দ্র দেবনাথ। তাদের পাঠানো হয় ময়মনসিংহ কারাগারে। সেখানে ২৫ দিন কারা ভোগের পর প্রেরণ করা হয় টাঙ্গাইল কারাগারে। সেখানে ৪ দিন কারা ভোগের পর জামিনে মুক্তিপান এ সাহসী ভাষাসৈনিক।

১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর ভর্তি হন রংপুরের কারমাইকেল কলেজে। ছাত্রাবস্থায় ১৯৫৮ সালে প্রয়োজনের তাগিদে তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী সৈয়দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছু দিন শিক্ষকতা করে বদলী হয়ে আসেন হাদিরা বাঘেরঘাট স্কুলে। ১৯৬২সালে শিক্ষকতা ছেড়ে চাকুরী নেন স্বাস্থ্য বিভাগে। দীর্ঘ দিন চাকুরী করার পর ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন এবং পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ব্যক্তি জীবনে হযরত আলীর কোন ভাই-বোন নেই। তাঁর এক ছেলে আশরাফুল আলম একজন কলেজ শিক্ষক। চার মেয়ে মেহেরুন্নেছা, সেলিনা, নাজমা ও লাকি আক্তার বিবাহীতা।

প্রায় ৬৭ বছর আত্ম অভিমানে লুকিয়ে থাকা এ ভাষা সৈনিক আক্ষেপ করে বলেন, আমি যখন মাতৃগর্ভে ছিলাম তখন আমার বাবা মারা যান। তাই মায়ের প্রতি, দেশের প্রতি আমার ভালোবাসাটা অনেক বেশি। যেহেতু মা আজ নেই তাই মাটিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। যতদিন বাঁচবো মানুষের সেবা করে যাব। ভাষা আন্দোলনের বিষয়টি আমার স্ত্রী সন্তানসহ শুভাকাঙ্খিরা জানতো।

ভাষা সৈনিকদের কোন মূল্যায়ন না থাকায় তারা সে সময়কার ঘটনা গুলো স্মৃতিচারণ করতে দিতো না। কিন্তু গত ২০১০ সালে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে গোপালপুর উপজলা প্রশাসনের পক্ষ হতে ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখার জন্য এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমাকে ‘রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ক্রেষ্ট’ প্রদান করা হয়। ভাষা আন্দোলনে অবদান রাখায় যা আমার জীবনের প্রথম কোন সম্মাননা।

(মজলুমের কণ্ঠ/২০ ফেব্রুয়ারি/আর.কে)

 সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles