পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু রোধে নেই কোন উদ্যোগ

পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু রোধে নেই কোন উদ্যোগ

।। মির্জা শাকিল ।।

 

(( এক গবেষনায় জানা গেছে, ডুবে যাওয়া বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২,০০০ শিশু মারা যায় পানিতে ডুবে। দিনে প্রায় ৩০ জন।))

বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য শিশুর মৃত্যু ঘটে পানিতে ডুবে। প্রতিটি শিশুই অমিত সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়। একটু সচেতনতা অবলম্বন এবং কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলে শিশু মৃত্যুর এই সংখ্যা অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। তবে পরিতাপের বিষয় এব্যাপারে তেমন কোন সরকারী-বেসরকারী পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

অথচ প্রতিটি শিশুই রাষ্ট্রের নাগরিক। পিতামাতা তার অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। শিশুর জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অভিভাবক, সমাজ এবং রাষ্ট্রের এক অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজ্য দায়।

এবছরও বর্ষাকাল আসার আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনই সংবাদপত্রে দেখা যাচ্ছে পানিতে ডুবে শিশুদের করুণ মৃত্যু সংবাদ।

রবিবার (জুন ১৪) দিনাজপুরের বিরল এবং হাকিমপুর উপজেলায় পানিতে ডুবে তিন কন্যা শিশু মারা যায় (তথ্যসূত্র-দ্য ডেইলি স্টার) ।এদের মধ্যে ছয় বছর বয়সী একজন খেলতে গিয়ে বাড়ির পাশে পুকুরে ডুবে যায়। সাত এবং আট বছর বয়সী অপর দুজন বাড়ির পাশের পুকুরে গোসল করতে গিয়ে ডুবে যায়।

একইদিন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় পৃথক দুটি ঘটনায় পানিতে ডুবে মারা যায় আরো দুই কন্যা শিশু (তথ্যসূত্র-প্রথম আলো অনলাইন) । এই দুইজনের একজনের বয়স তিন। মায়ের সাথে নানার বাড়ি বেড়াতে এসে খেলা করার এক পর্য়ায়ে বাড়ির পাশের ডোবাতে পড়ে যায় সে । ছয় বছর বয়সী অপরজন বাড়ির পাশের খালে পা ধুতে গিয়ে পানিতে পড়ে ডুবে যায়। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

একই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় এই দুই শিশুসহ নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি উপজেলায় গত তিন সপ্তাহে মোট ১২টি শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। এরমধ্যে কলমাকান্দায় চারজন, কেন্দুয়া, সদর এবং পূর্বধলায় দুজন করে ছয়জন এবং দুর্গাপুর এবং আটপাড়ায় একজন করে শিশু রয়েছে। এই শিশুদের বয়স দের থেকে নয় বছরের মধ্যে।

এই কিন্তু শেষ নয়। প্রতি বছরের ন্যয় এবারও বর্ষা মৌসুমের প্রতিদিনই ঘটতে থাকবে এভাবে পানিতে ডুবে একের পর এক শিশু মৃত্যর হৃদয়বিদারক ঘটনা।

এক গবেষনায় জানা গেছে, ডুবে যাওয়া বাংলাদেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২,০০০ শিশু মারা যায় পানিতে ডুবে। দিনে প্রায় ৩০ জন।

 ব্লুমবার্গ ফিলান্ট্রোপিজ, জন হপকিন্স আন্তর্জাতিক আহত গবেষণা ইউনিট, ইনজুরি প্রতিরোধ ও গবেষণা কেন্দ্র বা সিআইপিআরবি এবং ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার বা আইসিডিডিআর বি যৌথভাবে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এই গবেষণা চালিয়েছে। সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ শিশু তাদের বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে ডুবে মারা যায় এবং গ্রামাঞ্চলে মহিলারা সাধারণত গৃহকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকাকালীন সকাল ১০ টা থেকে দুপুর একটার মধ্যে মৃত্যু ঘটে যখন তাদের শিশুরা বাড়ির পাশে পুকুর বা জলাশয়ে গিয়েছিল। একটি সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ব্লুমবার্গ ফিলান্ট্রোপিজের পরিচালক কেলি লারসন বলেছিলেন, “এর সবচেয়ে বড় কারণ পরিবারের অসচেতনতা।” গত দুই বছরে সাতটি উপজেলায় এক থেকে চার বছরের মধ্যে প্রায় ৭১,০০০ শিশু জরিপ করা হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ডুবে যাওয়া শিশুদের নিয়ে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছিল। এর পরও বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের তেমন কোন প্রচার প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।

প্রতিদিন বাড়ি থেকে কাজে বের হবার সময় বাড়ির ঠিক পাশের ছোট্ট পুকুরটার দিকে চোখ পড়লেই প্রিয় সন্তান হারানোর অব্যক্ত যন্ত্রনায় মুহূর্তে মোচড় দিয়ে ওঠে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পৌরসভার বানিয়াবাড়ি এলাকার জাহিদুল ইসলামের হৃদয়। গত বছর নভেম্বর মাসের শেষদিকে এই পুকুরে ডুবেই মারা যায় তার চার বছর বয়সী একমাত্র ছেলে নাইম।

শুধু জাহিদুলই নয়, সেদিন একই সাথে একই বয়সী প্রিয় সন্তান আবিরকে হারিয়েছিল পাশের বাড়ির আবু বকরও। জানা যায়, নাইম ও আবির সেদিন একই সাথে বাড়ির পাশে খেলতে যায়। খেলার ছলে একপর্যায়ে শিশুদুটি পুকুরে পড়ে যায়। পরে তাদের দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয়রা।

শুধু জাহিদুল আর আবু বকরই নয়, এদেশের কত শত-সহস্র বাবা-মা যে এভাবে তাদের প্রিয় বুকের ধনকে হারিয়েছেন, সে কথা শুধু ঐসব হতভাগ্যরা ছাড়া আর কেইবা মনে রেখেছে।

 গত ২ এবং ৩ জুন টাঙ্গাইলের ভূয়াপুর উপজেলার শালদাইর এবং ঘাটাইল উপজেলার শিমলা পূর্বপাড়া গ্রামে যথাক্রমে আড়াই এবং চার বছর বয়সী দুই শিশু বাড়ির পাশের পুকুরে ডুবে মারা যায়। ঘটনার সময় এক শিশুর মা ধান শুকাচ্ছিল এবং অপর শিশুর মা গৃহস্থালী কাজে ব্যস্ত ছিল।        পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে তাঁর কর্ম এলাকায় এধরণের কোন প্রচার প্রচারণা আছে কিনা জানতে চাইলে, নেই বলে জানান টাঙ্গাইলের জেষ্ঠ্য তথ্য কর্মকর্তা কাজী গোলাম আহাদ। এব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টিতে দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে তিনি মনে করেন।   এদিকে কোন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান অথবা শিশুদের সমস্যা বা সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে এমন কোন সংগঠন পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করছে বলেও জানা যায়নি।  শিশুদের সমস্যা নিয়ে কাজ করে এমন একটি বেসরকারী সংগঠন শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন। এর চেয়ারম্যান মুঈদ হাসান তড়িৎতের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিন বলেন যদিও তাঁর সংগঠন শিশুদের অনেক সমস্যা নিয়েই কাজ করেছে তবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু কমানোর ব্যাপারে কোন সচেতনতা সৃষ্টির মতো অতীব জরুরী বিষয়টি নিয়ে এখনও কিছু করা হয়ে ওঠেনি।   তবে সচেতন মহলের বিশ্বাস সামান্য কযেকটি উদ্যোগ যেমন অভিভাবকদের সচেতন করা, শিশুদের সচেতন করা, বাড়ির পাশে ডোবা-নালা বা পুকুরের চার পাশে বেড়া দিয়ে আটকে দেয়া, পত্র-পত্রিকায় এবং টিভিতে সচেতনামূলক প্রচারণা, শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচারণা, মাইকিং,  পানিতে ডোবা রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ প্রদান, হাসপাতালে পানিতে ডুবে যাওয়া রোগীর জন্য প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, পাঁচ বছরের বেশী বয়সী শিশুদের সাঁতার শেখানো ইত্যাদি নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করার মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।  সবচেয়ে বেশি দূর্ঘটনা ঘটে দুপুর বেলায় যখন মায়েরা রান্না বা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন অন্তত সে সময় তাদের উচিত শিশুদের কারো তত্ত্বাবধানে রাখা।

(লেখক দ্য ডেইলি স্টারের টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি)

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ১৯ জুন /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles