মানুষই জয়ী হবে

মানুষই জয়ী হবে

।। দুর্লভ বিশ্বাস ।।

করোনাভাইারাস নামক এক ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র অদৃশ্য দানবের তান্ডবে সারা বিশ্ব আজ কম্পমান। ধনী-দরিদ্র কাউকে পরোয়া করছে না প্রকৃতি প্রদত্ত অদৃশ্য এ দানব। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বন্ধুক, কামান, আনবিক ও পারমানবিক এমনকি হাইড্রোজেন বোমা দিয়েও কেউ লড়তে পারছে না এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এসব মরণাস্ত্রের মালিকরাও করোনার কাছে নাস্তানাবুদ।

তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে মানুষের শ্রমে ঘামে হাজারো বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে উঠা এ সভ্যতা কী ধংস হবে নাকি বিগত দিনের মতো মানুষই জয়ী হবে। এ প্রশ্নের উত্তর মানুষ যে বিজয়ী হবে সে কথাই বলে।

মানব সভ্যতাকে ধংস করার প্রকৃতির নানা নামের ভয়াল এই রূপের একেবারে গোড়ার কথা জানা কখনো সম্ভব নয়। তারপরেও যতটুকু জানা যায় তাতে দেখা যায় সম্ভবত ২৫০ সাল থেকে ৫৪১ সাল পর্যন্ত ‘বিউ বণিক প্লেগ’ নামের এক ভাইরাস মানব সভ্যতা যে ধংস করতে হিংস্র থাবা বিস্তার করে। তাতে এত লোকের প্রাণহানি ঘটে যে মরদেহগুলো শেষে গণকবর দিতে হয়। শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির সেই হিং¯্রতার মাঝেও মানুষেরই বিজয় হয় বলে ইতিহাস সাক্ষী দেয়।

মানবের বিরুদ্ধে প্রকৃতি আবার ১১৩৪ সালেও হিংস্র হয়ে উঠে। ‘ প্লেগ ব্লাক ডেথ’ নাম ধারণ করে চীন, এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫০ বছর দাপিয়ে বেড়ায়। এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এত ধংসের পরও মানুষের বিজয় হয়। এ ছাড়া শত বছর আগে ১৯২০ সালে সপানীস ফ্লু নামক প্রকৃতির ভয়ঙ্কর থাবার কথা সবার জানা। সেই ফ্লুতে প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন সংহারের পরও মানব সভ্যতা টিকে রয়েছে অর্থাৎ মানুষেরই বিজয় হয়েছে।

ইবোলা নামক ভাইরাসের কথাও আমরা জানি। ১৯৯৭ সালে প্রকৃতি প্রদত্ত এই ভাইরাসের খামখেয়ালিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু সে ইবোলাও মানুষের কাছে পরাজিত হয়েছে। এ ছাড়া ম্যালেরিয়া, কালোজ্বর, কলেরা এবং গুটি বসন্তের নাম দুনিয়াব্যাপী না হলেও আমাদের এ উপমহাদেশের মানুষের প্রায় সবারই জানা এবং শোনা। প্রকৃতির এই ভয়াল রূপগুলোও লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়েছে।

ম্যালেরিয়া এবং কালাজ্বর সারা বছরই এ উপমহাদেশ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে হিংস্র রূপে হানা দিত। এতে হাজার হাজার মানুষের জীবন প্রদীপ অকালে নেভে যেত। এই ম্যালেরিয়া এবং কালাজ্বর প্রায় সম্পূর্ণভাবে মানুষের কাছে পরাভূত হয়েছে বর্তমানে এ কথা বলাই চলে। একইভাবে গুটি বসন্ত এবং কলেরা প্রকৃতির এই দুই হিংস্র রূপ মানুষের জ্ঞান গরিমার কাছে বহু আগে পরাজিত হয়েছে। আমি নিজেও কলেরা এবং গুটি বসন্তের হিংস্রতা প্রত্যক্ষ করেছি।

আমার বয়স ৬ কিংবা ৭ বছর ছিল। কার্তিক মাসের শেষ দিকে অথবা অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিকে তা সঠিকভাবে বলতে না পারলেও তখনো আমি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ যে মাড়াইনি তা মনে আছে। হঠাৎ একদিন চার পাড়া নিয়ে গঠিত গ্রামের যে পাড়ায় আমার বাড়ি শুধু সেই পাড়াতেই একদিনে কলেরায় মৃত্যু ১২ অথবা ১৩ জনের। এতে গ্রামটিতে যে ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল তা এখনো মনে আছে। ১৯৬৪ সাল আমি ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সে বছরই প্রথম আমাদের বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়। যার চিহ্ন এখনো আমার বাম হাতে রয়েছে যা আমৃত্যুই থাকবে। ওই বছরই গুটিবসন্তে আমাদের গ্রামের ৩ পাড়া থেকে নারী-শিশু মিলে ২৮/২৯ জন লোকের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে এক বাড়ির চারসদস্যের মধ্যে তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছিল তা এখনো আমার মনে আছে।

শুধু আমাদের গ্রামই নয় কালাজ্বর এবং গুটি বসন্ত নামে প্রকৃতির এই দুই হিংস্র থাবায় জনপদের পর জনপদ সে সময় বিরান হয়ে যেত বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। কলেরা ও বসন্তের এই ভয়ঙ্কর হিংস্রতার কারণে কার্তিক ও ফাল্গুন এ দু’মাস যে ব্যক্তি বাঁচবে সে অন্তত এক বছরের জন্য বেঁচেছে এমনতর কথা গ্রামীন এলাকায় প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। সেই কালাজ্বর ও গুটি বসন্ত মানুষের জ্ঞানের দ্রুতির কাছে পরাজিত হয়ে অতীত স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস ও দাবানলসহ নানা নামে প্রকৃতি মানব সভ্যতাকে ধংস করতে বারবার উদ্যত হয়। এতে প্রচুর মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু তারপরও আবার মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

প্রকৃতির নানা নামের ভয়ঙ্কর থাবা ছাড়াও মানবরুপী দানবরাও মানব সভ্যতা ধংস করতে বিভিন্ন সময়ে উদ্যত হয়েছে। মানুষের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি মরণাস্ত্র নিয়ে কখনো আধিপত্য বিস্তার আবার কখনোবা ধর্মের নামে যুদ্ধের মাধ্যমে ধ্বংস করতে এসব মানবরূপী দানবরা উদ্যত হয়েছে। প্রাক ঐতিহাসিক যুগ ছাড়াও শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধেই কম করে হলেও ২ কোটি মানুষের মৃত্যু হয় বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা। এর মধ্যে জাপানের নাগাসকি ও হিরোশিমাতে আমেরিকার আনবিক বোমায় হত্যা করা হয় কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষকে। এ ছাড়া ইহুদি ও কমিউনিস্টদের দমনের নামে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে কারো মতে ৬ লাখ আবার কারো মতে ৬০ লাখ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এজন্য ভবিষ্যতে কঠোর শাস্তি হতে পারে ভেবে এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের হোতা অ্যাডলফ হিটলার আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়। আধিপত্য বিস্তারের নামেই হোক অথবা ধর্মের নামেই হোক মানবরূপী এসব দানবদের ভয়াল সেই উন্মত্ততার পরও মানুষেরই জয় হয় এবং মানব সভ্যতা ক্রমে উন্নত হয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ১৯৭১। সে সময় মানবরূপী দানব ইয়াহিয়া খানরা চেয়েছিল মানুষ নয় শুধু এদেশের মাটি। কিন্ত সেই বর্বর ইয়াহিয়ারা পরাজিত হয় এবং আমরাই বিজয়ী হই। এ ছাড়াও মানবরূপী এসব দানবরা খাদ্যের অভাব ঘটিয়েও মানুষকে ধংস করতে চেষ্টা করেছে। এ চেষ্টারই ফলশ্রুতিতে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয় যা ইতিহাসে ৫০-র মন্বন্তর নামে পরিচিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে সে সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজার থেকে সব খাদ্য শষ্য তুলে নেওয়া হয়। এতে দুই বাংলায় ভয়বহ খাদ্য সংকট দেখা দেয়। পরিস্তিতি এমন পর্যায়ে যায় যে পকেট ভর্তি টাকা আছে কিন্ত কোথাও খাদ্য নেই। এমনি অবস্থায় যে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয় তাতে ৫০ লাখ মানুষ না খেতে পেরে মারা যায় বলে ইতিহাস পাঠে জানা যায়। মানবরূপী দানবদের মানবতাকে ধংস করার চেষ্টার নজির ইতিহাসে বহু রয়েছে কিন্তু মানবরূপী দানবরা সাময়িকভাবে সফল হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে মনুষত্বের অর্থ্যাৎ মানুষেরই বিজয় হয়েছে।

পরিশেষে করোনাভাইরাস নামক প্রকৃতির যে ভয়ঙ্কর রুপ ইতিমধ্যেই বিশ্বের কয়েক লাখ লোকের মৃত্যু ঘটিয়েছে এবং অর্ধকোটিরও বেশি মানুষ অদৃশ্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আনবিক পারমানবিক এবং রাসায়নিক বোমার মালিক দেশগুলোও এর হাত থেকে রেহাই পায়নি। মানব সভ্যতা তথা মানুষকে ধংসে উদ্যত এই করোনা নামক ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব আজ কম্পমান। হাজারো বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠা সভ্যতা টিকবে কী টিকবে না তা নিয়ে অনেক মনীষীই উদ্বিগ্ন। আবার অনেক মনীষী আশাবাদী। তারা বলেন, মানুষ তার জ্ঞানভান্ডার দিয়ে প্রকৃতিকে মানব কল্যাণে কাজে লাগিয়ে যে সভ্যতা গড়ে তুলেছেন তা করোনা ভাইরাস ধংস করে দিতে পারে না। বিগত দিনের মতো প্রকৃতির এই ভয়ঙ্কর রূপের বিরুদ্ধেও মানুষই জয়ী হবে। সে জন্যই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।’

এই ভয়াল অবস্থা অচিরেই কেটে ঘিয়ে করোনার বিরুদ্ধেও মানুষই জয়ী হবে।

লেখক : অধ্যাপক দুর্লভ বিশ্বাস, সংবাদকর্মী ও সাবেক কমান্ডার মির্জাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

 

মজলুমের কণ্ঠ / ১৩ জুন /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles