তিনদিন ধরে ঘুরছেন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী

তিনদিন ধরে ঘুরছেন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী

অনলাইন ডেস্ক:

বিশ বছরের তরুণ শরীরে বাসা বেঁধেছে ক্যানসার। ক্যানসার আক্রান্ত সুমনের দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন। চিকিৎসকরা ছয়টি পরীক্ষা করতে দিয়েছেন। এরমধ্যে একটি করোনাভাইরাস পরীক্ষা। পাঁচটি পরীক্ষা হলেও করোনা পরীক্ষা করাতে পারেননি। যে কারণে ভর্তি হতে পারছেন না হাসপাতালে। মিলছে না মরণব্যাধি ক্যানসারের চিকিৎসা। করোনা পরীক্ষার জন্য রাতে না ঘুমিয়ে ছুটে যান হাসপাতালে।

দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান। রাত শেষে সকালে হতাশ হয়ে ফিরেন। স্বল্পসংখ্যক মানুষ করোনা টেস্টের সুবিধা পাচ্ছেন। টেস্ট প্রত্যাশীদের ভিড়ের কারণে তাই বেশিরভাগ মানুষই ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। গতকাল মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফটকের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও পরীক্ষা করাতে পারেননি সুমন। সুমনের মতোই প্রতিদিন শত শত মানুষ পরীক্ষা করাতে না পেরে ফিরে যান। আবার পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ হলেও রিপোর্ট পাচ্ছেন না অনেকে। রিপোর্টের জন্য দিনের পর দিন হাসপাতালে আসা-যাওয়া করছেন। এভাবে চিকিৎসা সেবা নিতে গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের অজান্তেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিতে পারেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় ক্যানসার আক্রান্ত সুমনের সঙ্গে। সিএনজি অটোরিকশা করে মোহাম্মদপুর থেকে চাচা হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান সুমন। রাতে ঘুমাননি। রাত ৪টায় বাসা থেকে বের হন। ভোর ৫টার আগেই হাসপাতালে পৌঁছে লাইনে দাঁড়ান। সিরিয়াল নম্বর ৬৭। তবুও ভাগ্যে জোটেনি করোনা পরীক্ষার সুযোগ। তার আগেও আর দু’দিন মুগদা হাসপাতালের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। আদৌ করোনা টেস্ট করাতে পারবেন কিনা- এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।

সুমনের চাচা হেলাল উদ্দিন জানান, হাসপাতালে যারা সিরিয়াল নম্বর দেন তাদের বারবার বলেছেন সুমন ক্যানসারের রোগী। করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট না এলে তার চিকিৎসা জুটবে না। তবুও হেলাল উদ্দিনের কথার গুরুত্ব দেননি কেউ। তিনি জানান, হাঁটুতে একটি টিউমার ছিল সুমনের। প্রায় চার মাস আগে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এ অপারেশন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ইনফেকশন দেখা দেয়। এ থেকেই শরীরে বাসা বাঁধে ক্যানসার। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসা করানো যাচ্ছিল না। তিন মাস আগে গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে যান সুমন ও তার চাচা হেলাল। জমি বিক্রি করে, ঋণ করে টাকা নিয়ে ঢাকায় ফিরেন। মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গেলেই ছয়টি পরীক্ষা দেয়া হয়। এরমধ্যে করোনা পরীক্ষা করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

ভুক্তভোগীরা জানান, ফটকের বাইরে লাইন ঠিক থাকে না। অনেকেই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন। আনসার সদস্যরা থাকেন ফটকের ভেতরে। আবার অনেকে তদবির করে সিরিয়াল নেন। লাইনে না দাঁড়িয়েই পরীক্ষা করান তারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ নিয়ে গত বুধবার বাকবিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। প্রতিদিন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯০ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়। এরমধ্যে ৪০ জনকে একটি এনজিও’র সহযোগিতায় ফ্রি টেস্ট করা হয়।

করোনা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন উত্তর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সানজিদা রহমান। কিন্তু তিনি করোনা আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেননি। সানজিদার স্বামী মেহরাব কবির জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর গত ২৫শে জুন করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো রিপোর্ট পাননি। মেহরাব কবির বলেন, আবার টেস্টের নমুনা নিতে অনুরোধ করেছি। টাকা দিয়ে টেস্ট করাতে চাচ্ছি। দু’দিন যাবত চেষ্টা করছি। কিন্তু সিরিয়াল পাচ্ছি না। করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট না পাওয়ায় চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন পোশাক কর্মী ইসমত আরা। জুরাইনের আলম মার্কেটের নিউ জেনারেশন নামে একটি কারখানায় চাকরি করেন তিনি।  প্রায় এক সপ্তাহ আগে কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে বলা হয় তাকে। ডাক্তাররা পরামর্শ দেন করোনা টেস্ট করাতে হবে। টানা দুই রাত জেগে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু করোনা পরীক্ষা করাতে পারেননি। গত ২৮শে জুন করোনা পরীক্ষার নমুনা দেন ইসমত আরা। কিন্তু গত চার দিনেও রিপোর্ট পাননি। ইসমত আরা বলেন, চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়েছে। করোনা হলে বাসায় থেকে চিকিৎসা নেব। সুস্থ হলে কাজ করবো। কিন্তু রিপোর্ট না পেলে চাকরিই থাকবে না।

স্ত্রী রেহেনার শ্বাসকষ্ট। লক্ষ্মীপুর থেকে ঢাকায় এনে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করেন। রেহেনার স্বামী গাড়ি চালক রিয়াজ জানান, সেখানে গত ২৭শে জুন পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে করোনা পরীক্ষা করান। পরদিনই রিপোর্ট আসে। করোনা পজিটিভ। চিকিৎসদের পরামর্শে ভর্তি করা হয় মুগদা হাসপাতালে। রেহেনার সার্বক্ষণিক সঙ্গী তার স্বামী রিয়াজেরও উপসর্গ রয়েছে। টাকা দিয়ে মুগদা হাসপাতালে পরীক্ষা করানোর চেষ্টা করছেন কয়েক দিন যাবত। ভোররাতে লাইনে দাঁড়িয়ে নমুনা দিতে পারছেন না তিনি। রিয়াজ জানান, তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানির গাড়ি চালক। করোনা টেস্ট না করিয়ে নেগেটিভ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওই চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না তিনি।

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ০৩ জুলাই /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles