বেশি বয়সে সন্তান, ভালো নাকি খারাপ

বেশি বয়সে সন্তান, ভালো নাকি খারাপ

অনলাইন ডেস্ক:

প্রথমে বিয়ে, তারপরে পরিবার পরিকল্পনা, সন্তানধারণ করা… এই প্রতিটি ঘটনা জীবনকে আনন্দপূর্ণ করে তোলে। এই প্রতিটি পদক্ষেপ হল নতুন ভাবে জীবন সূচনা করার এক একটা ধাপ। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই সময় নানা কারণের জন্য অন্যদের চেয়ে দেরি করে, বেশি বয়সে এই নতুন জীবন ‘শুরু’ করেন, তখন কী ঘটে?

বেশি বয়সে বিয়ে বা সন্তান ধারণের প্রবণতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। পশ্চিমা সমাজে এই ধরনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই ঘটছে, তবে সম্প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও এই প্রবণতা ধীরে ধীরে চোখে পড়ছে। কেউ পরিস্থিতির চাপে, আবার কেউ কেউ প্রথমে তাদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও লক্ষ্য পূরণ করার জন্য এই পথে হাঁটছেন। কারণ যা-ই হোক না কেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা যে চ্যালেঞ্জগুলির মুখে পড়ছেন সেগুলি কম-বেশি একই রকম।

এর জন্য কি তাঁদের ‘খারাপ’ মুসলিম বলা যায়?

এটি এমন একটি প্রশ্ন, যা প্রতিটি পুরুষ এবং মহিলার মনে ঘুরপাক খায়, যখন তাঁরা বেশি বয়সে বিয়ে করেন বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনে রাখতে হবে ইসলামে বিবাহে এবং পরিবার গঠনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, সেই সঙ্গে ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের জন্য উপযুক্ত যে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার সম্পূর্ণ অধিকার দেয়। ফলে কেউ যদি দেরি করে বিয়ে করার বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাকে ভুল বলা যায় না।

বাচ্চাদের উপরে অল্প বয়সি ও বেশি বয়সি বাবা-মায়ের প্রভাব নিয়ে প্রচুর সমীক্ষা করা হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, বাবা-মায়ের বয়সের প্রভাব শিশুর মন বা সুস্থতার উপরে পড়ে। ফলে সন্তানকে ভালো ভাবে বড় করে তোলার জন্য একটাই জিনিস দরকার: বাবা-মায়ের ভালোবাসা। তাঁদের বয়স এই ভালোবাসার উপরে কোনও প্রভাব ফেলে না।

মুদ্রার দুই পিঠ

জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কিছু ভালো ও খারাপ দিক রয়েছে, এবং পরিণত বয়সে বাবা-মা হওয়ার সিদ্ধান্তও তার মধ্যে অন্যতম। আপনি যদি সন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন বা আপনার বয়স বেড়ে যাওয়ার পরে আপনি বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছেন, তাহলে আপনি এই বিষয়গুলি বিবেচনা করতে পারেন। নীচে সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

ইতিবাচক দিক

পরিণত মানসিকতা 

বলা যেতেই পারে যে, সন্তান-কে বড় করে তোলার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের ম্যাচিওরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের বয়স যত বেশি বাড়ে, জীবন আমাদের বিভিন্ন শিক্ষার মধ্যে দিয়ে তত বেশি বুঝতে সাহায্য করে যে, মনের কথা খুলে বলা, ধৈর্য, আপস ও সহ্যশক্তির মতো গুণ কতটা অপরিহার্য। সন্তানকে বড় করে তোলার সময় সুশিক্ষা দেওয়ার জন্য বাবা-মায়ের মধ্যে এই গুণগুলি থাকা খুবই জরুরি।

উপলব্ধি

বয়স যত বাড়ে, মানুষ তত সময়, অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতির মূল্য বুঝতে পারে। যখন বয়স কম থাকে, তখন অনেকেরই মনে হয় যে হাতে অনেক সময় রয়েছে। ফলে তারা জীবনের অনেক ‘ছোটখাটো’ বিষয়কে উপেক্ষা করেন। কিন্তু যারা বেশি বয়সে বাবা-মা হন, তাঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তানপ্রাপ্তির জন্য আল্লাহের কাছে কৃতজ্ঞ থাকেন ও তাকে চোখের সামনে বড় হতে দেখে উপলব্ধি করেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কতটা অমূল্য।

সময়ের মূল্য বুঝতে পারা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং বেশি বয়সে যারা সন্তানলাভ করেছেন তাঁরা হয়তো অল্পবয়সি বাবা-মায়েদের চেয়ে এই বিষয়ে সন্তানদের অনেক ভালো শিক্ষা দিতে পারবেন। কারণ তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে সেই অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন।

মানসিক প্রস্তুতি

প্রচুর যুবক-যুবতী বিয়ের পরে প্রাকৃতিক নিয়মেই বাবা-মা হয়ে যায়। কিন্তু যারা বেশি বয়সে বিয়ে করেন বা সন্তান নেন, তাঁরা এই বিষয়ে অনেক বেশি চিন্তাভাবনা করে, পরিকল্পনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন। ফলে মানসিক ভাবে তারা সন্তানের জন্য অনেক বেশি প্রস্তুত থাকেন।

নতুন করে ছোটবেলা ফিরে পাওয়া

শিশুরা আমাদের তরুণ রাখে। তাদের কাছে থাকলে, সকলেই বেশি হাসিখুশি থাকেন, শিশুদের সাথে খেলায় মেতে ওঠেন এবং প্রত্যেকেই নিজের বয়স ভুলে তাদের সাথে আরও একবার শৈশবে ফিরে যান।

সমস্যা যেখানে

বয়স

এই সত্য অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই: যারা বেশি বয়সে বাবা-মা হয়েছেন তাঁরা সন্তানের কৈশোরেই বৃদ্ধ হয়ে যাবেন। ফলে যাঁরা বেশি বয়সে সন্তান নেন তাঁরা হয়তো অনেক কিছুই দেখে যেতে পারবেন না বা অনেক অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবেন, যেমন – নিজের সন্তানকে জীবনে সফল হতে দেখা বা সন্তানদের বিয়ে কিংবা দাদা-দাদী হওয়া।

জেনারেশন গ্যাপ

জীবন এবং ধর্ম উভয় ক্ষেত্রেই, দুই প্রজন্মের সংস্কৃতির মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এখন যুগ দ্রুত বদলাচ্ছে, তার সাথে প্রতি বছর ‘আধুনিক‘ এবং ‘প্রাচীনে‘র সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে ‘নতুন‘ এবং ‘পুরোনো‘র ভাবনা। দুই প্রজন্মের মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে চিন্তাভাবনা ভিন্ন হবে এবং এই পার্থক্য বয়সের ব্যবধানের সাথে বৃদ্ধি পাবে।

প্রাণশক্তির অভাব

কুড়ি বা তিরিশ বছর বয়সে একজন লোকের মধ্যে যে প্রাণশক্তি থাকে, তা চল্লিশ বছর বয়সে থাকে না। কিন্তু একটি শিশু সব সময় প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকে। ফলে বেশি বয়সি বাবা-মায়ের পক্ষে শিশুর সাথে তাল মিলিয়ে চলা ও তাদের সঙ্গ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বোঝা হয়ে যাওয়া

এটি সম্ভবত প্রত্যেক বাবা-মায়ের মনের সবচেয়ে বড় ভয়। কিন্তু বেশি বয়সে সন্তান নেওয়া বাবা-মায়েরা এই বিষয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন হন। কারণ তাঁরা এমন বার্ধক্যজনিত অসুখে আক্রান্ত হতে পারেন যার জন্য অল্পবয়সি সন্তানের উপরে অতিরিক্ত দায়িত্ব তৈরি হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, বেশি বয়েসে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে অবশ্যই তার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তবে, সব সময় আপনার সন্তানলাভের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার জন্য আল্লাহের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকুন।

 

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ১৬ জুলাই /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles