স্মার্টফোন পেয়ে শিশুরা কোন পথে ?

স্মার্টফোন পেয়ে শিশুরা কোন পথে ?

।। রেজাউল করিম ।।

ছ’মাস আগেও শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন বেমানান ছিল। ফোন ব্যবহারে অভিভাবকের ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। কোভিট-১৯ পাল্টে দিয়েছে সেই প্রেক্ষাপট। গত ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ভিডিও ক্লাস আপলোড করছে। ফলে বইয়ের পরিবর্তে যুক্তিসঙ্গত কারণেই শিক্ষার্থীর হাতে শোভা পাচ্ছে স্মার্টফোন। ডিজিটাল ক্লাসের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস থাকাটাই স্বাভাবিক। এই মুহুর্তে অনলাইন বা টিভিতে ক্লাস পাওয়াটাও কম কিসের ? এতে ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হচ্ছে। ফলে অনলাইন ক্লাসের উপকরণ ডিভাইজ ও ইন্টারনেট সহজলভ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সহজে আসক্ত করায় শিশুদের মোবাইল ফোন চালানো নিষিদ্ধ ছিল। সেই স্মার্টফোন শিশুরা কিভাবে ব্যবহার করছে ? বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহার বুঝলেও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ফোন বা অনলাইন সম্পর্কে কতোটুকু ধারণা আছে? স্মার্টফোন হাতে পেয়ে অপব্যবহার করছেনাতো ? যদি ফোনের অপব্যবহার হয় সেক্ষেত্রে উদ্দেশ্য পন্ড হয়ে ক্ষতির পাল্লাটাই ভারী হবে। টিভিতে ক্লাস দেখতে রিমোট শিশুদের কন্ট্রোলে। ভিডিও ক্লাস দেখতে স্মার্টফোন শিশুদের নাগালে। অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে, শিশুরা ক্লাসের নামে টিভিতে কার্টুন বা অন্যকোন অনুষ্ঠানে আসক্ত কিনা। আবার ভিডিও ক্লাসের নামে নিষিদ্ধ কোন ওয়েব সাইটে শিশুরা আসক্ত হচ্ছে কিনা। মোড়ে-মোড়ে মোবাইল হাতে শিশুদের আড্ডা। আসলে ওরা কি করছে? মোবাইল পেয়ে কোন পথে শিশুরা? করোনাকালে কাদা মাখা হচ্ছে না শিশুরা। ঘেমে-নেয়ে বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফিরছে না। ঘরে থেকে শিশুরা ইনডোরগেমে আসক্ত হচ্ছে কিনা অভিভাবকদের জানাটা জরুরী। এক কথায় অনলাইনে ভালো-মন্দ দুদিকেই ডুবে থাকা সম্ভব। অপরিপক্কতার কারনে যেন শিশুরা লাইনচ্যুত না হয়। সম্প্রতি শিশুরা স্মার্টফোন হাতে পেয়ে ক্লাসের ফাঁকে আসক্ত হচ্ছে অনলাইন ভিত্তিক গেম,নিষিদ্ধ ওয়েব সাইট ভিজিটে। অনলাইন সচল রাখতে ডাটা কিনতে গিয়ে শিশুরা পরিবার থেকে বলে, না বলে টাকা নিচ্ছে। গেমের কার্যকলাপ দেখে শিশুরা উগ্র হয়ে উঠছে। শিশুদের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা। এক্ষেত্রে ক্লাসগুলো ইউটিউবে আপলোড না করে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক জুম-এ্যাপে শিক্ষার্থীদের সংযোগ করলে নির্ধারিত সময় শেষে শিশুদের অফলাইনে রাখা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টদের ধারনা।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৪ থেকে ২৪ বছর বয়সীরা দ্রুত ইন্টারনেটে আসক্ত হয়। সঙ্গত কারণে এই ধাপের শিশুরা মোবাইল ফোন হাতে পাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩-১৭ বছর বয়সী অর্ধেকের বেশি শিশু সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার অধিক সময় ব্যয় করে ভিডিও গেমস, কম্পিউটার, ই-রিডার্স, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক প্রযুক্তির পিছনে। করোনাকালে সেই ব্যবহার বেড়েছে দ্বিগুন। একটি গবেষণায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে ঢাকা শহরের নাম উঠে আসে।

‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে। উইকিপিডিয়ার মতে ভিডিও গেমসের আবিষ্কার হয় ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে। তারপর সত্তর-আশির দশকের মধ্যে এটি জনপ্রিয়তায় পোঁছে। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত আর্কেড টাইপের ভিডিও গেম ছিল কম্পিউটার স্পেস। এরপর আটারি কোম্পানি বাজারে আনে বিখ্যাত গেম পং। তারপর আটারি, কোলেকো, নিনটেনডো, সেগা ও সনির মতো ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো নানা উদ্ভাবন ও প্রচারণা চালিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে দেয় পুঁজিবাদী সভ্যতার এ বিনোদনপণ্য। ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শতকরা ৬৮ ভাগ আমেরিকানের বাড়ির সবাই ভিডিও গেম খেলে। বর্তমানে পৃথিবীতে ২২০ কোটি মানুষ ভিডিও গেম খেলে। এদের অধিকাংশই অল্প বয়সী। যার বদৌলতে গ্লোবাল ভিডিও গেম বাজারের আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০৮.৯০ মিলিয়ন ডলার।

স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে গেমিং প্রতি বছর ১৯শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাবজি অর্থাৎ প্লেয়ার্স আননোন ব্যাটেল গ্রাউন্ড! বর্তমান জনপ্রিয় অনলাইলন গেম। পৃথিবীতে প্রতি মাসে ২২৭ মিলিয়ন মানুষ এ গেম খেলে। আর প্রতিদিন খেলে ৮৭ মিলিয়ন মানুষ। বাংলাদেশেও প্রতিদিন এ গেম খেলছেন ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ! গেমটিতে একসাথে ১০০জন মানুষ একটি পরিত্যক্ত দ্বীপে থাকে। খেলোয়াড়কে প্রথমে প্যারাসুটের মাধ্যমে সেখানে নামিয়ে দেয়া হয়। সেখানে একে অপরকে হত্যা করে টিকে থাকতে হয়। ভয়ংকর সব গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে শেষ করতে হয় সবাইকে। এক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতারও আশ্রয় নেয়া হয়। চলে হত্যার ষড়যন্ত্র-পরিকল্পনা। অনলাইনে বন্ধুরা পরস্পরে কথাবার্তা বলে এ হত্যাযজ্ঞের পরামর্শ করে। কয় পয়েন্ট পাওয়া গেল, কতজন নিহত হল, বাকিদেরকে কীভাবে হত্যা করা যায় – এসবই এ ভয়ংকর গেমের বিষয়। হত্যাযজ্ঞ শেষে যে ব্যক্তি বা যে গ্রুপ বেঁচে থাকে, তারাই হয় বিজয়ী। ফ্রি- ফায়ারও জনপ্রিয় কম নয়। ২০২০ সালে বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী ৬০ শতাংশ। এ সময়ে স্মার্টফোন ব্যবহার বৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে ৭ নম্বরে উঠেছে বাংলাদেশ। জিএসএম এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) এক গবেষণার পর জানিয়েছে ভিডিও গেমে আসক্তি এক ধরণের মানসিক রোগ। ভারতের গুজরাট হাই কোর্ট নির্দেশ দেয় জনসম্মুখে পাবজি গেম খেলা নিষিদ্ধ। নেপাল, ইরাক ও জর্ডানেও নিষিদ্ধ । ইতিপূর্বে ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যান, মনস্টার হান্টার ওয়ার্ল্ড, ডটা টু, ভাইস সিটি এবং হাঙ্গারগেমসহ অসংখ্য গেমে আসক্তি বাড়ছে। ‘কল্পনার জগতে গিয়ে গেমের প্রিয় নায়কের সাক্ষাতলাভের জন্য ২৪তলার ছাদ থেকে কিশোরের লাফিয়ে আত্মহত্যা, অতিরিক্ত গেম খেলায় বাবার বকুনি খেয়ে অভিমানী তাইওয়ানী কিশোরের নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া, একটানা ২২ ঘণ্টার লাইভ ভিডিও গেম খেলে যুবকের মৃত্যু, গেমের জন্য টাকা জোগাড় করতে ১৩ বছরের ভিয়েতনামী কিশোরের ৮১ বছরের বৃদ্ধাকে হত্যা করে মানিব্যাগ চুরি, চায়না দম্পতির কম্পিউটার গেমের অর্থের জন্য নিজেদের তিন সন্তানকে ৯হাজার ডলারে বেচে দেয়া’ গেমাসক্তির ঘটনা ঘটেছে। ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ঘটিত এ আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল মাদক’ বলেন। ২০১৮ সালের জুনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ ১১তম সংশোধিত সংস্করণে (আইসিডি-১১), ‘গেমিং অ্যাডিকশন’ হিসেবে একে মনোস্বাস্থ্য সমস্যা বলেছেন।

২০১৩ সালে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত মানসিক রোগ নির্ণয় বিষয়ক গাইডলাইনে (ডিএসএম-৫) বিষয়টিকে ‘ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বিটিআরসির তথ্যমতে, এপ্রিল ২০১৯এ বাংলাদেশে প্রায় ৯ কোটি ৩৭ লাখ ইন্টারনেটের গ্রাহকের মধ্যে ৮ কোটি ৭৯ লাখ ব্যবহারকারী মুঠোফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটে যুক্ত হয়। ব্যবহারকারীদের ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫০০ জনের মস্তিস্ক স্ক্যান করে দেখেছেন, যেসব শিশু দিনে সাত ঘণ্টারও বেশি স্মার্টফোনে গেমস খেলে, তাদের মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থের বহিরাবরণ পাতলা হয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, মোবাইল ফোন পকেটে রাখলে ভ্রুণের কোয়ালিটি কমে যাওয়া, বুক পকেটে রাখলে হার্টের সমস্যাসহ কম বয়সে চশমা পড়াও ডিজিটাল মাদকাসক্তির কারন। দক্ষিণ কোরিয়ার রেডিওলজি’র অধ্যাপক ইয়ুং সুক কিশোর কিশোরীদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছেন যারা ইন্টারনেটে বেশি সময় দেন তাদের মস্তিস্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে ও ডিপ্রেশনে ভোগে।

ভার্চুয়াল স্টেজে দাঁড়িয়ে আমি ইন্টারনেটের বিরোধিতা করছি না। শুধু অভিভাবকদের সচেতনাতার অনুরোধ করছি। আজকের শিশুরা যেন আগামী দিনে ডিজিটাল মাদকাসক্ত না হয়। ব্যক্তিগত নয়, অভিভাবকদের মোবাইল সেট শিশুদের ব্যবহারের জন্য দিলে অনেকটা সংশয় কেটে যাবে। তারপরও অনুপযুক্ত ওয়েবসাইট ভিজিট করছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। গেম খেলার আকুতি, তীব্র আকাঙ্খা, নতুন কিছুর চেয়েও ইন্টারনেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াটাই আসক্ত মনে করতে হবে। পার্থক্য হচ্ছে এটি আচরণগত আসক্তি, আর অন্যান্যগুলো রাসায়নিক আসক্তি। শিক্ষার্থীরা যেন স্মার্টফোন হাতে পেয়ে ডিজিটাল মাদকাসক্ত না হয় সেদিকে সচেতনতা বাড়ানো অভিভাবকদের জন্য জরুরী।

লেখক : সংবাদকর্মী

Related Articles