অতঃপর একজন নুরুল হক নুর

অতঃপর একজন নুরুল হক নুর

।। রেজাউল করিম ।।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা নুরুল হক নুর। কোটা সংস্কার আন্দোনে তার পরিচিতি। হামলা, মামলায় তার পরিচিতি বেড়েছে বহুগুন। অতঃপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি । সর্বশেষে জাতীয় সংসদ উপ-নির্বাচনে আসার গুঞ্জন। আন্দোলন-সংগ্রামের মাঝপথে ধর্ষণে সহয়তার অভিযোগে আটক হয়ে সমালোচনায় পড়েন ভিপি নুর। রাজধানীর লালবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীর দায়েরকৃত মামলায় আটক হন নুর। যদিও ওইদিন রাতেই মুচলিকা দিয়ে ছাড়া পান তিনি। ক্যারিয়ারের এমন পর্যায়ে হোঁচট খাওয়া নুরের ক্যারিয়ার শেষ নাকি শুরু এমন আলোচনা মুখে-মুখে। বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুুষের মত পার্থক্য রয়েছে। কেউ নুরুকে সরাসরি অপরাধি মনে করছেন। আবার অপরাধের অভিযোগ থাকলেও নুরকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে কেউ উল্টো অভিযোগ তুলছেন। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয়রানি করা হচ্ছে এমন যুক্তিতে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সমর্থকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকদিন বিক্ষোভ করেছে। এই মামলা প্রত্যহার না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন নুরের অনুসারিরা।

নুরের বিরুদ্ধের অভিযোগ একদম যৌক্তিক , নুরের সমর্থকদের যুক্তিও অযৌক্তি না। ধর্ষণ হওয়ার আট মাস পর ধর্ষিতার মনে পড়েলো তিনি ধর্ষণের শিকার। মাথায় এলো থানায় মামলা করতে হবে। যেই মামলা সেই প্রশাসনের পদক্ষেপ। অভিযোগ, ধর্ষিতা তার কাছে বিচার চেয়েছিলেন। নুরও বলেছিলেন, বিচার করে দেবেন। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে দেবেন। কথা রাখেনি নুর। তাই ধর্ষণে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, ওই ধর্ষিতা ফের ধর্ষিত হন একমাস পর। এখানে ধর্ষক আরেকজন। এখানেও নুর আসামি। এ নিয়ে দু’টি পৃথক মামলা হয়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করছে। অবশ্যই সত্যিটা বেরিয়ে আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নুর আটক হলো, আবার রাতেই মুক্ত কেন? আর ধর্ষিতা ধর্ষণের সাত-আট মাস পর ধর্ষণ মামলা করলেন কেন? এমনতো হতে পারে ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়কের সঙ্গে ওই ছাত্রীর সম্পর্ক ছিল। দুইজনের সম্মতিতে এমন ঘটনা ঘটে। যদিও এটাও অপরাধ। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর হয়তো ধর্ষণ মামলা দেওয়া হয়েছে।

একজন অরাজনৈতিক ছাত্র ঢাকা বিদ্যালয়ের ভিপি হবেন, নের্তৃত্ব দিবেন পুরো ছাত্রগোষ্ঠিকে এটা একসময় অনেকেই ভাবেননি। আবার কেউ কেউ নুরকে নিয়ে আরও বড় কিছু ভেবেছেন। তবে যে যেভাবেই ভাবুক ২৮ বছরের মাথায় ঢাবির নির্বাচিত ভিপিকে নিয়ে ভাবনাটা ছোট রাখার কোন সুযোগ নেই। কতোটুকু সফল হয়েছেন সেটা মূলত শিক্ষার্থীরা বিশ্লেষণ করবে। ভিপি নুর ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক হন। ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে নুর তরুণদের নেতৃত্বে একটা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নুর বিভিন্ন আন্দোলনে ১০ বার হামলার শিকার হন। এর আগে ২০১৯ সালে ২৪ ডিসেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় মামলা দায়ের করে এবং হামলার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, ইয়াাসিন আরাফাত তূর্য এবং দপ্তর সম্পাদক মেহেদী হাসান শান্তদের সাথে গ্রেপ্তার হন নুর।

বাবা ইদ্রিস হাওলাদারের কৃষিকাজ আর চায়ের দোকান থেকেই নুরের জীবন সংগ্রামের শুরু। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে নুরের আজকের অবস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুটা তার তেমন পরিচিতি না থাকলেও তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছে দেশব্যাপী আলোচিত কোটা সংস্কার আন্দোলন। নেতৃত্ব দেয়ার কারণে এ সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় তাকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা, মামলা মুখোমুখি হন নুর।
কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় নুরকে বেধরক পেটানো ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পা জড়িয়ে ধরে বাঁচার আর্তনাদের ছবি দেখে এখনো অনেকের চোখ ভিজে আসে। মানুষকে মানুষ এভাবে মারতে পারে! এমনকি তাকে জেলে দেয়া হয়েছিল। ওই সময় বেসরকারি হাসপাতালে প্রকাশ্যে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। তবুও চালিয়ে গেছেন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। এমনকি ডাকসু নির্বাচন চলাকালে নির্বাচনে অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন। তারপরও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে তাকেই নেতা নির্বাচিত করেছিল। এতো সংগ্রামের পর টিকে থাকা আজকের নুরকে ছোট ভাবার কোন সুযোগ নেই।

যে নুরের পাশে একসময় সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়া কাউকে নজরে পড়েনি সেই নুুরের প্রতিটি পদক্ষেপে এখন সবার নজর। নুর এখন দেশের একটি ফ্যাক্টর। যে নুরের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গণমাধ্যমের অনিহা ছিল এখন প্রতিটি গণমাধ্যমে নুর। নুরকে নিয়ে এখন টক-শো হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সে উবারে গেল না সরকারি গাড়িতে গেল বিশ^বিদ্যালয় বাসে গেল নাকি গণভবন থেকে পাঠানো গাড়িতে গেল। সে ছাত্রলীগের সাথে গেল না আলাদা গেল এনিয়ে গমাধ্যম ব্যস্ত। সেইসব সংবাদের পক্ষে-বিপক্ষে ফেসবুকে ঝড় উঠতো। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে সম্পূর্ণ পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ডবিহীন একজন সাধারণ ছাত্র অতঃপর একজন নুরুল হক নুর হয়েছেন । তিনি যা করেছে তারই বা কমতি কোথায়? কোটা আন্দোলনের মত একটা সফল আন্দোলনের পর তার কাছে আর কিছু না চাওয়াটাই ভাল। অনেক কিছুতেই কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না সেক্ষেত্রে ২৮ বছর পর ডাকসু সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করা , সফল কোটা আন্দোলন শেষ করা সাধারণ ছাত্রদের জন্য এটা অনেক বড় পাওনা।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার আন্দোলন পরিষদের নেতা ডাকসু ভিপির অনেক কিছু করার ছিল। হয়তো সে পারেননি। কিন্তু এটাকে বাস্তবায়ন করতে গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে নুরের পথ অনুসরণ করে পরবর্তী প্রজন্ম সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে। ক্ষমতাসিন দল ছাত্রলীগকে টপকিয়ে নুরের জয়টা মুলত সারাদেশের কোটা আন্দোলনকারীদের সফলতা নিশ্চিত করেছিল। ছাত্ররা শক্তি ছাত্ররাই বল সেটা প্রমান করেছিল সেদিনের ডাকসু নির্বাচন।

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাষা বুঝে নীতি-নৈতিকতার স্থানে অটল থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের বড় একটি অংশের সমর্থন পাচ্ছেন তিনি। সেই ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থনকে যদি সে মূল্যায়ন করতে পারে তাহলে একদিন ছাত্রছাত্রীর সমর্থনটা বেড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আন্দোলনরত নূরকে সবাই অন্য দলের কর্মী হিসেবে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো। তখন নূরকে জোরপূর্বক শিবির কর্মী বানাতেও দিধা করতো না। নির্বাচিত ভিপি নূরকে সবাই নিজের দলে টানার চেষ্টা করতো। ওই সময় ছাত্রলীগ চাইতো কিভাবে তাকে সাথে রেখে একাট্টা হয়ে কাজ করা যায়। নুরকে ছাত্রলীগের ধাওয়ার পর, ভুল শুধরে সেইদিন বিকেলে গিয়ে শোভনের কোলাকুলি তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ছাত্রদলও চেয়েছিল তাদের অপরাগতা চাহিদাগুলো নূরের মাধ্যমে প্রকাশ করতে। ছাত্রলীগকে ছাত্রদলের পাল্টা ধাওয়াও নুরের পক্ষে থাকার বহিঃপ্রকাশ ছিল।

আজকের নুর হতে তাকে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে জায়গা করতে চেষ্টা করছে। বিরোধী দল হিসেবে কোন দলকেই শক্ত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় নুর তার ছাত্র অধিকার পরিষদের সমর্থন নিয়ে যদি রাজনৈতিক দল তৈরি করে তাহলে নুরের অবস্থান কেমন হবে এটাও অনেকে ভাবছেন। এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে এখন হাল ছাড়বেন, নাকি তার অবস্থানে অনঢ় থাকবেন ? ২৮ বছর পর ডাকসুর নির্বাচন সফল করা, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে সফল প্রতিনিধিত্ব করা, উপ-নির্বাচনে অংশ নেওয়া এমনকি রাজনৈতিক দল তৈরির ঘোষণা দিয়ে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন নুর। বিরোধী দল যা না করতে পেরেছে নুর তা করে দেখিয়েছেন। ফলে নুরের উপর আস্থাও বেড়েছে। সুতরাং নুরকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তিনি এখন বিশাল এক ছাত্র-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি তিনি একজন নুরুল হক নুর।

লেখকঃ সংবাদকর্মী

Related Articles