প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা এবং কিছু ভাবনা

প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা এবং কিছু ভাবনা

।। রেজাউল করিম ।।

 

‘লাউহাটী উপজেলা চাই’ কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন একটি পোস্ট দেখেছিলাম। যতোদুর মনে পড়ে পোস্টটি করেছিলেন তালেব নামের একজন অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী। দাবিটা দেখে প্রথমে অনেকটা অবাক হয়েছিলাম। একজন ছাত্রের এককভাবে উপজেলা পরিষদ চাওয়ার বিষয়টি বেমানান মনে হচ্ছিল। তিনচার বছর আগে তালেবের সাথে পরিচয় এমন আরেকটি অদ্ভুত দাবির মাধ্যমে। তার জমির উপর পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি পড়ায় লাইন বন্ধের দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অর্ধশত বিভাগে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তালেব। যদিও সরকারি উন্নয়নমুলক কাজ হওয়াতে লাইন টানা তখন বন্ধ হয়নি। যথারীতি বিদ্যুৎ সরবরহ হয়েছিল। সেই বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীর হাতে দেখা ‘লাউহাটী উপজেলা চাই’ এখন ‘ধলেশ্বরী উপজেলা চাই নামে’ আলোচনায় এসেছে। তখন কেউ এতটা গুরুত্ব দেয়নি। বর্তমানে কিছু বিশেষ ব্যক্তি প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা বাস্তবায়নে তদবির চালাচ্ছে এমন গুঞ্জনে আগ্রহীরা উল্লাসিত। এ দাবিটা এখন অনেকেরই। অন্যদিকে প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলাতে যেতে অনাগ্রহীরা আন্দোলন শুরু করেছে। পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন দেখে মনে হয় এটা তালেবের আন্দোলন না। এর পেছনে অবশ্যই বিশেষ কেউ চেষ্টা তদবির করছেন। ১২ অক্টোবর সোমবার দুপুরে অনাগ্রহী ইউনিয়নগুলোর জনসাসাধারণ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা বাস্তবায়নে শক্তিশালী পদক্ষেপ থাকায় আন্দোলনকারীরাও জোড়ালো ভুমিকা পালন করছে। মুলত দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটী, ফাজিলহাটী, নাগরপুর উপজেলার মুগনা, পাকুটিয়া এবং মির্জাপুর উপজেলার আনাইতাড়া ও বানাইল এই ছয় ইউনিয়ন নিয়ে প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা ভাবা হচ্ছে।

দেলদুয়ার, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলার যেসব ইউনিয়নকে ধলেশ্বরী উপজেলাতে অন্তর্ভুকক্তের হিসেব ধরা হয়েছে তারা অনেকেইে নিজনিজ উপজেলা ছাড়তে নারাজ। এর আগেও মির্জাপুর ও দেলদুয়ারে পৃথকভাবে অনাগ্র প্রকাশ করে মানববন্ধ করে আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের অবস্থা দেখে এখন অনেকটাই নিশ্চিত তালেব সেদিন না বুঝে ‘লাউহটিী উপজেলা চাই ’ পোস্টটি করেননি।

সভ্য মানুষ অবশ্যই চায় জাতি আরও সভ্য হোক। অনুন্নত অঞ্চল চায় এলাকা আরও উন্নত হোক। তদ্রুপ উপজেলা হবে সবাই খুশি হওয়ার কথা । আলোচনার বিষয় উপজেলা হলে কতোটুকু লাভ বা ক্ষতি হবে। প্রস্তাবিত লাউহাটী উপজেলা কেনই বা হঠাৎ ধলেশ্বরী উপজেলা হচ্ছে। নতুন এই উপজেলা লাউহাটী নাকি নতুন কোন স্থানে হবে এনিয়ে আলোচনা কম হচ্ছে না। কেউ কেউ বলছে লাউহাটীর পরিবর্তে নাগরপুর-দেলদুয়ার উপজেলার সংযোগস্থল কনোরাতে ধলেশ্বরী উপজেলা হতে পারে।

মির্জাপুর, নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলা থেকে দু’টো করে ইউনিয়ন কেটে নিয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে কথিত ধলেশ্বরী উপজেলার। এ সংক্রান্ত সরকারি কোন ঘোষণা আসেনি। তবে জানা গেছে, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে জোর তদবির করছে একটি মহল। যে ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন উপজেলার কথা চলছে সেসব ইউনিয়নের কিছু মানুষ উৎসাহ দেখালেও অধিকাংশ মানুষ এমন প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছেন।

তারা বর্তমানে যে উপজেলার অংশ হিসেবে আছেন, থাকতে চান সেভাবেই। নতুন কোন উপজেলার বাসিন্দা হওয়ার ঘোর বিরোধী করছেন তারা। এ নিয়ে ইতোমধ্যে সেসব ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হয়েছে স্বত:স্ফূর্ত বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা। স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠিত এসব প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন হাজার হাজার মানুষ। দলমত নির্বিশেষে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এমন একটি সর্বদলীয় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় বানাইল ইউনিয়নের স্থানীয় ভাবখন্ড প্রইমারী স্কুল মাঠে। মির্জাপুর উপজেলার বানাইল ও আনাইতারা ইউনিয়নের সকল শ্রেণির পেশা মানুষ সমবেত হন এই সমাবেশে। মির্জাপুর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইউনিয়ন দু’টি কথিত ধলেশ্বরী উপজেলার সাথে সংযুক্ত করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন সমাবেশকারীরা।

দেলদুয়ার উপজেলার ফাজিলহাটী ইউনিয়নবাসী ১ অক্টোবর ফাজিলহাটীতে পৃথকভাবে মানববন্ধন করেন। কথিত ধলেশ্বরী উপজেলা করার উদ্যোগ জনমনে অসন্তুষ্টির পাশাপাশি সৃষ্টি করেছে ব্যাপক বিতর্কের। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন উপজেলার যৌক্তিকতা নিয়ে। টাঙ্গাইলে কেন আরো একটি নতুন উপজেলা?

১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহ থেকে পৃথক করে মহকুমা টাঙ্গাইলকে পরিণত করা হয় জেলায়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমৃদ্ধ জেলা টাঙ্গাইল। কালিহাতী, মির্জাপুর, নাগরপুর, মধুপুর, গোপালপুর, টাঙ্গাইল, ঘাটাইল ও বাশাইল থানা নিয়ে গঠিত হয় এই জেলা। পরবর্তীতে ভূয়াপুর, সখিপুর, ধনবাড়ী ও দেলদুয়ার সংযুক্ত হয় এই তালিকায়। ৪০ লাখ মানুষের এই জেলার থানাগুলো পরবর্তীতে উপজেলায় উন্নীত করা হলে সারাদেশের মধ্যে প্রথমে আদর্শ উপজেলা হিসেবে বেছে নেয়া হয় মির্জাপুরকে। উন্নয়নের দিক থেকে টাঙ্গাইল অনেক পিছিয়ে ছিল। যমুনার উপর বঙ্গবন্ধু সেতু, রেল লাইন ও অতি সম্প্রতি ঢাকা-টাঙ্গাইল হাইওয়ে চার লেনে রূপান্তরিত হওয়ায় এলাকাটিতে জীবন-জীবিকা অনেকটাই সহজতর হচ্ছে। তবে গোটা জেলার জন্য এসব উন্নয়ন মোটেও যথেষ্ট নয়। দক্ষিণ টাঙ্গাইল খ্যাত মির্জাপুর ও নাগরপুরের বড় একটি এলাকা এখনো রয়ে গেছে অনুন্নত-অবহেলিত। রাজধানী ঢাকা শহরের প্রবেশ দ্বার হিসেবে পরিচিত মির্জাপুর। এই উপজেলার বানাইল ও আনাইতাড়া ইউনিয়নবাসী কেন মির্জাপুর ছেড়ে কল্পিত ধলেশ্বরীর চরে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করবে? নাগরপুর ও দেলদুয়ারের ৪টি ইউনিয়নবাসীর প্রশ্নও এক এবং অভিন্ন। ময়মনসিংহকে বিভাগে উন্নীত করা হলে টাঙ্গাইল জেলাকে তাতে অন্তর্ভূক্তির প্রস্তাব আসে। টাঙ্গাইল জেলাবাসী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। তারা থেকে যান ঢাকা বিভাগের অধীনে। স্বাভাবিকভাবে এসব ইউনিয়নবাসীও থাকতে চান নিজ নিজ উপজেলায়। অকারণে মানুষের এ আকাঙ্খার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।

দেলদুয়ার একসময় টাঙ্গাইল-৫ আসন টাঙ্গাইল সদরের সাথে যুক্ত ছিল। তখন টাঙ্গাইলের তুলনায় দেলদুয়ার ছিল অবহেলিত। এরপর দেলদুয়ার যুক্ত হল টাঙ্গাইল-৬ নাগরপুর আসনের সাথে। এখনও দেলদুয়ার অবহেলিত। সংসদ সদস্য হচ্ছে নাগরপুর থেকে। উন্নয়নের ছোঁয়া কমই লাগছে দেলদুয়ারে। দেলদুয়ার উপজেলাটি এখনও পৌরসভা হতে পারেনি। এমনিতেই পিছিয়ে। অবহেলিত এই উপজেলাকে ভেঙে আরেকটি উপজেলা তৈরি করলে দেলদুয়ার আরও অবহেলিত হবে কিনা এ নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে এ অঞ্চলের মানুষ। এয়াড়া দেলদুয়ার ছেড়ে নতুন উপজেলাতে কেন যাবে এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আলোচনা উঠেছে কিছু বিশেষ ব্যক্তি ধলেশ্বরী উপজেলা বাস্তবায়নে ভাবছেন। সুতরাং ধলেশ্বরী উপজেলাটা বাস্তবায়ন হওয়াটা অনেকটা সম্ভাবনার পথে।

এছাড়া নতুন একটি উপজেলা। শিকড় থেকে শেখড় পর্যন্ত নতুন করে সাজাতে হবে। অবকাঠামো থেকে শুরু করে জনবল পর্যন্ত নতুন করে বাড়াতে হবে। সরকার প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলা কোন ধরণের যুক্তিতে বাস্তবায়ন করবে এটা নিয়েও ভাবনার বিষয় কম না। নতুন একটি উপজেলা হলে এটাকে কোন সংসদীয় আসনে যুক্ত করা হবে সেটাও ভাবনার বিষয়।

নতুন উপজেলা না করেও এলাকার উন্নয়ন করা সম্ভব। ধলেশ্বরী নদীর উপর সেতু না থাকায় দক্ষিণ টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সেতুটি নির্মান হওয়ায় জেলার দক্ষিণ অংশের জনসাধারনের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে সহজ। তেমনি উন্নয়ন বা এলাকাবাসীর ভাগ্যোন্নয়নের স্বদিচ্ছা থাকলে তাদের জন্য অনেক কিছু করা যেতে পারে। বিশেষ করে যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প কারখানা ও কৃষি উন্নয়নে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনলে জনস্বার্থে কাজ করা হবে। দেলদুয়ার থেকে পাকটিয়া হয়ে ঢাকার সাথে, মির্জাপুরের পাকুল্লা থেকে সাটুরিয়া হয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত রাস্তার উন্নয়ন করা যেতে পারে। টাঙ্গাইল সদর থেকে নাগরপুর সড়কে প্রস্থতা বাড়ানো যেতে পারে। চিকিৎসা সেবার মান বাড়াতে প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। দক্ষিণ টাঙ্গাইলে তেমন কোন শিল্প কারখানা নেই। এ অঞ্চলের বেকারত্ব দুরিকরণে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যেতে পারে। লৌহজং ও ধলেশ্বরী নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ এলাকা প্রতিবছর বন্যা কবলিত হয়। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন পুনঃ খনন করা যেতে পারে। তরুণদের লাইনচ্যুত ফেরাতে উপজেলা পর্যায়ে সম্ভব হলে ইউনিয়ন ভিত্তিক পাঠাগার তৈরি অথবা বন্ধ থাকা পাঠাগারগুলোকে পূণঃরায় চালু করা যেতে পারে। মাদক থেকে সড়াতে উপজেলা অথবা সম্ভব হলে ইউনিয়ন পর্যায়ে খেলার মাঠ তৈরি, সংস্কার বা খেলাধুলা সামগ্রী বাড়ানো যেতে পারে। বেকার যুবকদের কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে কারিগরি প্রতিষ্ঠান বাড়ানো এমন কি কর্মমূখী শিক্ষার বাস্তব অভিজ্ঞতার জন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে। কৃষির প্রতি আগ্রহ বাড়াতে কৃষি সহযোগিতা বাড়ানো, বিশেষ করে লেবু চাষীদের সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে লেবুকে এ অঞ্চলের অর্থকরী ফসলে রুপ দেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি দেশ-বিদেশের পরিচিত টাঙ্গাইল শাড়ি বিলপ্তির পথে। তাঁতপল্লীর দুর্দিন। তাঁতীদের পাশে দাঁড়িয়ে এ পেশার খ্যাতি ধরে রাখা যেতে পারে। অতএব উপজেলা বাড়িয়ে সরকারের আর্থিক অপচয় না বাড়িয়ে এসব খাতের উন্নয়ন করলে এ অঞ্চলের মানুষ প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হবে।

এছাড়া দেলদুয়ার সদর সংলগ্ন ফাজিলহাটী ইউনিয়ন সহজেই পুলিশি সেবা পাচ্ছে। থানা হলে এরা এর বেশি সুবিধা পাবে বলে মনে হয় না। নাগরপুর উপজেলার মুগনা, পাকুটিয়া ধলেশ্বরীর পূর্বে হওয়ায় এটাকে দেলদুয়ারে সাথে সম্পৃক্ত করে দেলদুয়ারকে পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় আসন করা যেতে পারে। পাথরাইল ইউনিয়ন যদি কালক্রমে টাঙ্গাইল পৌরসভার সাথে যুক্ত হয় এবং দক্ষিণের লাউহাটী-ফাজিলহাটী এই দুই ইউয়িন যদি প্রস্তাবিত ধলেশ্বরী উপজেলাতে চলে যায় সেক্ষেত্রে দেলদুয়ার ভৌগলিকভাবে ছোট হয়ে যাবে। মির্জাপুর ও নাগরপুরও তদ্রুপ। এছাড়া নতুন উপজেলা না বাড়িয়ে বরং মির্জাপুর, নাগরপুর ও দেলদুয়ার উপজেলায় দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ফাঁড়ি করা যেতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষার্থে শেষ রায় দিবেন।।

লেখকঃ সংবাদকর্মী

 

 

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ১৪ অক্টোবর /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles