আজকের দিনে জয় বাংলা স্লোগানে মুখরিত হয় টাঙ্গাইল

রেজাউল করিম:

আজ ১১ ডিসেম্বর। উত্তোলন করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। টাঙ্গাইল শহর সম্পূর্ণ হানাদারমুক্ত হয়। হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে টাঙ্গাইল। কোভিট-১৯ করোনা ভাইরাসের কারনে দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে সল্প পরিসরে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

৪৯ বছর আগে এই দিনটি টাঙ্গাইলবাসীর জন্য এনেছিল বিজয়ের বার্তা। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পন ও পলায়নের মধ্য দিয়ে পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল টাঙ্গাইল। সারা রাত মুক্তিযোদ্ধাদের সারাশি আক্রমন ও প্রচন্ড গোলাগুলিতে বিনিদ্র রাত কাটায় শহর ও শহরতলির লোকজন। অবশেষে সে কাঙ্খিত মুহুর্তটি ঘুনিয়ে এল। ধবংস স্তুপের মধ্যে দিয়ে স্বজন হারাদের বিয়োগ ব্যাথা ভূলে হাজার হাজার উৎফুল্ল জনতা রাস্তায় নেমে প্রানের স্পন্দন আর মুক্তির আনন্দে নবজন্মের সেই মুহুর্তটিকে সবাই মিলে স্মরণীয় করে তুলেন। স্লোগান ধরেন জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। যুদ্ধকালীন সময়ে টাঙ্গাইলের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের কাহিনী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গঠিত ও পরিচালিত ‘কাদেরিয়া বাহিনীর’ বীরত্বের কথা দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।

৭১-এর ২৬ মার্চ সকালে আদালত পাড়ার অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলামের বাসভবনে এক সভায় গঠিত হয় টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীনবাংলা গণমুক্তি পরিষদ। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক ও সশস্ত্র গণবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান ও আব্দুল কাদের সিদ্দিকীসহ আরো ৮ জনকে সদস্য করে কমিটি গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আব্দুল মান্নান, টাঙ্গাইল, জামালপুর এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি শামছুর রহমান খান শাজাহান ছিলেন অগ্রগন্য। এক পর্যায়ে টাঙ্গাইলে গঠন করা হয় কাদেরিয়া বাহিনী । এই বাহিনীর প্রচন্ড প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাত শুরু করে পাক সেনাদের উপর। ক্রমান্বয়ে সংগঠিত হতে থাকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা । মুক্তিযুদ্ধের অল্প দিনের মধ্যেই কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী। এ বাহিনীর সদস্য ১৭ হাজারে উন্নীত হয়, এছাড়া ১৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীও কাদেরিয়া বাহিনীর সহযোগী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কাদেরিয়া বাহিনীর যুদ্ধ। এ সময় পাক হানাদারদের কাছে আব্দুল কাদের সিদ্দিকী ‘বাঘা সিদ্দিকী’ নামে এক মহাতঙ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এছাড়াও টাঙ্গাইলে খন্দকার আব্দুল বাতেন বাহিনীর নেতৃত্বে গঠিত ‘বাতেন বাহিনী’ অনেক জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। চারদিক থেকে আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাক বাহিনী।

টাঙ্গাইলে ৮ ডিসেম্বর প্রায় ৫ হাজার পাক সেনা এবং ৭ হাজার রাজাকার আলবদর অবস্থান করে। খান সেনাদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য যমুনা নদী পথে পাঠানো হয় ৭ টি জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও গোলাবারুদ। কাদেরিয়া বাহিনী গোপনে এই খবর পেয়ে কমান্ডার হাবিবুর রহমানকে দায়িত্ব দেয় জাহাজ ধবংস করার জন্য মাইন পোতার কাজে। জীবন বাজি রেখে মাটিকাটা নামক স্থানে ঘটানো হয় জাহাজ বিস্ফোরণ। দু’টি জাহাজে দু’ রাত দু’ দিন ধরে চলতে থাকে অনবরত বিস্ফোরন। বাকী জাহাজগুলো থেকে বিপুল পরিমান আধুনিক অস্ত্র সস্ত্র উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে। মুক্তি বাহিনীর এ সকল আক্রমন ও গোলাবারুদ ধ্বংস এবং অস্ত্র উদ্ধারে খান সেনারা মানসিক ভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। এপ্রিল থেকে ৮ডিসেম্বর পর্যন্ত টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় বিশাল কাদেরিয়া বাহিনী যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পর্যদস্ত করে খান সেনাদের। এসব যুদ্ধে ৩ শতাধিক দেশপ্রেমিক অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মুক্তিযোদ্ধাদের টাঙ্গাইল অঞ্চলের প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী যোদ্ধাদের নিয়ে সখিপুরের সহানন্দা ও কীর্ত্তনখোলায় গড়ে তুলের দুর্ভেদ্য দূর্গ। এর পর এক আক্রমণের মুখে পাক সেনারা গুটিয়ে জেলার অন্যান্য স্থান থেকে এসে যখন টাঙ্গাইল শহরে অবস্থান নেয় তখন উত্তর ও দক্ষিন টাঙ্গাইল ছিল সম্পূর্ন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে । ৮ ডিসেম্বর পরিকল্পনা করা হয় টাঙ্গাইল আক্রমনের। মিত্র বাহিনীর সঙ্গে সংর্ঘষ হয় পাক সেনাদের পুংলি নামক স্থানে। অবস্থা বেগতিক দেখে প্রাণ ভয়ে পাক সেনারা সারারাত ধরে টাঙ্গাইল ছেড়ে ঢাকার দিকে পালায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী চার দিক থেকে সারাশি আক্রমণ চালিয়ে পাক সেনাদের টাঙ্গাইল থেকে বিতারিত করতে সক্ষম হয় কাদেরিয়া বাহিনী। ১০ ডিসেম্বর রাতে টাঙ্গাইল প্রবেশ করেন কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক ভোলা।

১১ ডিসেম্বর সকালে কমান্ডার বায়োজিদ ও খন্দকার আনোয়ার টাঙ্গাইল পৌঁছেন। আসেন বিগ্রেডিয়ার ফজলুর রহমান। সার্কিট হাউজে অবস্থানরত খান সেনাদের কাদের সিদ্দিকীর কাছে আত্ম সমর্পনের মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ন ভাবে মুক্ত হয় টাঙ্গাইল। এ দিবসটি পালনে সরকারি বেসরকারিভাবে টাঙ্গাইলে বিভিন্ন কর্মসুচি গ্রহন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কাদেরিয়া বাহিনীর ১৫৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং ৫০০ মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়। এই বাহিনী থেকে ১৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রীয় খেতাব পান।

দিসবটি পালন উপলক্ষে স্বল্প পরিসরে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে টাঙ্গাইল পৌরসভা। আজ শুক্রবার সকালে শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শান্তির কপোত ও বেলুন উড়ানো, সূচনা সঙ্গীত ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে। শোভাযাত্রা উদ্বোধন করবেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক। বিকেলে আয়োজন করা হবে আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি। বিগত বছরগুলোতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে সপ্তাহব্যাপী কর্মসুচি পালন করা হলে এবার করোনার কারণে কর্মসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।

(মজলুমের কণ্ঠ / ১১ ডিসেম্বর /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles