সরকারি স্কুলে বয়সসীমায় ভর্তি বিড়ম্বনা

।। রেজাউল করিম ।।

 

পরীক্ষায় পাস করাটা জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। পাস করার পর সার্টিফিকেট ও নম্বর পত্র পাওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে নতুন শ্রেণিতে ভর্তি হওয়াটা বাড়তি আনন্দ বয়ে আনে । সেই আনন্দের ভর্তিটা যদি বাঁধাগ্রস্থ হয় তাহলে সেটা দুঃখজনক। হ্যা এবার তাই হচ্ছে। সরকারি স্কুলে প্রথম এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ভর্তিতে বয়সসীমা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁধাটা আগেও আসতে পারতো। সেক্ষেত্রে বিকল্প কোন পদক্ষেপ নেওয়া যেতো। বলতে পারেন এটা আগেরই সিদ্ধান্ত। হ্যা অবশ্যই আগের সিদ্ধান্ত। তবে প্রয়োগ ছিল না। হঠাৎ বয়সসীমা কার্যকর হওয়ায় সরকারি স্কুলে ভর্তি হতে পারছে না শিক্ষার্থীরা। এ দায় কে নেবে ? বয়সসীমার জন্য শিক্ষার্থী দায়ি হতে পারে না। উল্টো শিক্ষা অফিসের দিকেই অভিযোগের তীর। শিক্ষা অফিস ডিআর নেওয়ার আগে বিষয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট করেননি। এছাড়া বলা যেতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার বহিঃপ্রকাশ।

 

ভর্তি আবেদন শুরু হওয়ার পর হঠাৎ এমন কার্যকর পদক্ষেপ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলেছে। সমাপনী পরীক্ষার ডিআর এ শিক্ষার্থীর বয়স দেখে উপজেলা শিক্ষা অফিস সেই বয়স গ্রহণ করার পর হঠাৎ এমন পদক্ষেপ কতোটা যুক্তিযুক্ত বিষয়টা এখন সমালোচনায় পরিনত হয়েছে। কোমলমতি শিশুদের এই বয়সেই এমন হোঁচট খাওয়াটা আমাকেও ভাবিয়ে তুলেছে। সরকারি স্কুলে সামনে ও অনলাইনে আবেদনের জন্য বিভিন্ন কম্পিউটরের দোকানে অভিভাবকদের এমন আলোচনা দেখে ২০ডিসেম্বর ফেসবুক ওয়ালে “স্কুলে ভর্তির বয়সসীমার সমাধান জরুরী” শিরোনামে বিস্তারিত উল্লেখ করে একটি পোস্ট করেছিলাম। টাঙ্গাইলের নাগরপুরের সিরাজ আল মাসুদ নামের একজন স্থানীয় সংবাদকর্মী পোস্টটি অনেগগুলো গ্রুপে শেয়ার করেন। তখন আমি নিশ্চিত হই বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে ওই সংবাদকর্মীও ভাবছেন। এরপর লেখাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্ব আমাকে আরও স্পষ্ট করেছে। আশ্চর্য হলাম গণমাধ্যমও বিষয়টিকে এতো গুরুত্বভাবে প্রচার করেনি। তবে দৈনিক আমাদের সময় ও সময় টেলিভিশন অনলাই ও পূর্বপশ্চিম অনলাইন নিউজ পোর্টালসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম বিষয়টি তুলে ধরলেও এর সমস্যা, সমাধান বা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেনি। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শেষ করা দেশের সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে সংবাদ আশা করেছিলাম। ভর্তির সময় বাকি নেই। ভেবেছিলাম সরকার বিষয়টি নিয়ে পুণঃ বিবেচনা করবেন। কিন্তু করেননি। সংবাদকর্মীর পাশাপাশি ‘ইমপ্রুভ শিক্ষা পরিবার’ নামে একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছি ২০বছর ধরে। সঙ্গত কারণেই অভিভাবকরা নানা সময় শিক্ষা বিষয়ক নানা বিষয়াধি জানতে চান। গতকাল বেশ কিছু অভিভাবক ভর্তির বয়সসীমা সম্পর্কে পরামর্শ চেয়েছিলেন। উত্তর দিতে পারিনি। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই দু-কলম লেখা। যদি শিক্ষা বিভাগের ঘুম ভাঙে।

কোভিড-১৯ কোরনা ভাইরাস সংক্রমনে পুরো ২০২০ শিক্ষাবর্ষ কাটলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে। পড়ালেখা না হওয়ায় সরকার অটোপাস দিয়েছে। সিলেবাস শেষ করা শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার পরিচয় দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে অটোপাসে মনোক্ষুন্ন। তবে যারা পড়ালেখা করতে পারেনি তারা অনেকটাই সন্তুষ্টু। সবমিলিয়ে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা মানিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু ভর্তি নিয়ে হয়রানি মানবে কি করে?

গণমাধ্যমে উঠে এসেছে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে ১ম শ্রেণিতে ভর্তিতে শিক্ষার্থীর বয়স পাঁচ বছর নির্ধারণ করা হলেও ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে সে বয়স ছয় বছর করা হয়। তাই পরবর্তী শ্রেণিতে এসব শিক্ষার্থীর ভর্তির ক্ষেত্রে বয়স কীভাবে নির্ধারিত হবে তা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন প্রতিষ্ঠান প্রধান ও ভর্তি কমিটির সদস্যরা। এ জটিলতা নিরসনে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মো মোকছেদ আলী স্বাক্ষরিত নির্দেশনায়, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় শিক্ষর্থীর বয়স অনুসারে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে তার বয়স নির্ধারণ করতে হবে। আর ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১ম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় শিক্ষার্থীর বয়স অনুসারে পরবর্তী শ্রেণিতে তার বয়স নির্ধারণ করতে হবে।

হিসেব পরিস্কার। কিন্তু এটা কজন অভিভাবকের জানা থাকার কথা? বিষয়টি বিদ্যালয়কে জানানোর দায়িত্ব ছিল শিক্ষা অফিসের। ডিআর জমা নেওয়ার আগে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিষয়টি সম্পর্কে সতর্ক সংকেত দিলে এই সমস্যাটি হতো না। এ অবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো জন্ম সনদ জমা নিতে আরও সতর্ক থাকতো। কিন্তু শিক্ষা অফিস কোন পদক্ষেপ নেননি। বাবা-মা শিশুদের স্কুলে পাঠায়। সিক্স প্ল¬াস বয়সটা কজন বাবা-মা বোঝেন? ৬ শুরু নাকি ৬ শেষে ৭ শুরু হলে প্রথম শ্রেণির ভর্তি বয়স? বিগত বছরে এ নিয়ে এতোটা ভাবেননি সরকারি-বেসরকারি স্কুলগুলো। হঠাৎ এবছর ১১ প্লাস অর্থাৎ ১১ পেরিয়ে ১২ বছর না পড়লে তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করা যাচ্ছে না। অনলাইন সাপোর্ট করছে না। এ নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন অভিভাবকরা। এর সমাধানই বা কি ? এক্ষেত্রে যাদের জন্ম ডিসেম্বরে তারা মাত্র একমাস এমনকি যাদের জন্ম ৩০ ডিসেম্বর তারা মাত্র ১ দিনের জন্য প্রথম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারছে না। এদিকে ১ দিনের জন্য ভর্তি হতে না পারলে পরবর্তীতে তার জীবনে ১ বছর বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় বয়সসীমা নিয়ে আরও সুক্ষèভাবে ভাবতে হবে।

অন্যদিকে যেসকল শিক্ষার্থী সমাপনী পাস করে সনদ পেয়েছে সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর দায়ী হতে পারে না। কেননা, এটি শিশুর বয়স স্কুল অবশ্যই দেখেছেন। হয়তো বা শিশুর অভিভাবক মাত্র ১ দিনের জন্য পুরো বছরটি কমায়নি। তবে স্কুল থেকে পাওয়া ডিআর ( সমাপনী শিক্ষার্থীর তালিকা ) অবশ্যই প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বিষয়টি দেখেছেন। যদি সনদ পাওয়ার পর বয়সসীমা বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তাহলে শিক্ষা অফিসকে অবশ্যই আরও সজাগ হওয়া উচিৎ ছিল। শিক্ষা অফিস পরীক্ষা বন্ধ রাখতে পারতো। অথবা এফিডেভিট করে বয়স সংশোধন করতে পারতো সংশি¬ষ্ট শিক্ষার্থীর অভিভাবক। কোন সুযোগ না দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলা হচ্ছে।

এই মুহুর্তে যেসকল শিক্ষার্থী প্রথম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারছে না তাদের দায় অবশ্যই সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। এ দায় শিক্ষার্থীর কাঁধে দিয়ে শিশু বয়সে তাদের হোঁচট খাওয়ানো মোটেই উচিৎ হবে না। যদি বয়সসীমার ব্যবহার অব্যহত থাকে তাহলে প্রতিটি প্রাথমিক স্কুল বা কিন্ডার গার্টেনকে শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে বিষয়টির শতভাগ গুরুত্ব জানাতে হবে।

এদিকে বয়সসীমার বিষয়টি শুধু সরকারি স্কুলে দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি স্কুলে ভর্তিতে কোনা বাঁধা হচ্ছেনা। এমন কি রাজউক পা দেশের পুলিশ লাইন্স স্কুলগুলোতে বয়সসীমা কোন বাঁধা হচ্ছে না। প্রাইভেট স্কুলগুলোতেও বাঁধ নেই। তাহলে এক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দুই নিয়ম কেন? এরা কি উচ্চ মাধ্যমিক বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়তে পারবে না এমন প্রশ্ন অভিভাবকদের। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির ক্ষেত্রে জীবনের কোন এক সময় সার্টিফিকেটের বয়সসীমা পুণঃযাচাই করে তার সার্টিফিকেট বাতিল হবে ? এমন সম্ভাবনা থাকলে বিষয়টি ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত সমাধান করা উচিৎ।

কেউ কেউ নতুন জন্মসনদ উঠিয়েও ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্ত যাদের ফিঙ্গার প্রিন্টসহ পাসপোর্ট করা আছে তারাও নতুন সনদ তুলতে আটকে যাচ্ছে। যাদের জন্মসনদ আগে করেনি কিন্ত ভর্তির জন্য জন্মসনদের কোড নাম্বার বাধ্যতামূলক। সে ক্ষেত্রে নতুন করে জন্মসনদ পৌরসভা অথবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আনতে গেলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে অভিবাবকদেরকে। বর্তমানে অনলাইনে জন্মসনদের ভার্সন পরিবর্তন করে নতুন নতুন তথ্য দিতে হচ্ছে। বাবা ও মায়ের জন্মসনদ, ডাক্তার কর্তৃক বয়স নির্ধারণ সার্টিফিকেট,বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বরসহ অসংখ্য তথ্যের প্রয়োজন এতগুলো কাগজ পত্র তৈরি করে জন্মসনদ হাতে পেতে পেতে ভর্তির সময়সীমা চলে যাচ্ছে। নতুন জন্মসনদ তোলাও কোন বৈধ প্রক্রিয়া না। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান সরকারকেই করতে হবে।

যেসব শিশু কম বয়সে (সরকার নির্ধারিত বয়সের আগে) স্কুলে ভর্তি হয়েছিল এবং মেধাবী হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অপেক্ষমাণ, তাদের অভিভাবকরা পড়েছেন বিপাকে। বয়সের বাঁধায় সন্তানকে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তি করাতে পারছেন না। সরকার নির্ধারিত বয়সসীমা বাড়িয়ে বা কমিয়ে নতুন করে জন্মনিবন্ধন সনদ বের করে নিচ্ছেন। ফলে সরকারের যে উদ্দেশ্য, তা অনেকটাই ব্যাহত হতে পারে । নির্ধারিত বয়সে শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারছে না অভিভাবকরা। নতুন সনদ উঠানোতে ঝুঁকি রয়েই যাচ্ছে। শিক্ষা অফিস ডিআর পেয়েও বয়স সম্পর্কে কোন ধারনা দেননি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। তাহলে এ দায় কে নেবে। বিষয়টি পুঃণ বিবেচনায় এনে শিক্ষার্থীর ভর্তির পথ সহজ করা জরুরী।

লেখক: রেজাউল করিম-সংবাদকর্মী

rezaulpress.bd@gmail.com

 

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ২৭ ডিসেম্বর /আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles