উঠানে-উঠানে শিশুদের শহীদ মিনার

রেজাউল করিম:

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ দিবস। বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। মায়ের মুখের মিষ্টি ভাষা সবার মুখে-মুখে রাখতে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই শ্লোাগানের মিছিলে শহীদ হন ভাষা সৈনিকেরা। যাদের রক্তের বিনিময়ে বাঙালী জাতি তাদের মুখের ভাষা ফিরে পেয়েছে তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিবছর জাতি শ্রদ্ধার সাথে দিনটি স্মরণ করে থাকে। বছর ঘুরে এবার এসেছে অমর একুশে। এবারের একুশ উদযাপনে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করোনার সামাজিক দুরত্ব। তাই প্রতি বছরের মতো এবার উৎসাহ উদ্দিপনা নিয়ে শহীদ মিনারে ভীড় দেখা যায়নি। প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি উদ্যোগে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও তা নিতান্তই ছিল স্বল্পপরিসরে। বিশেষ করে শিশুদের তেমনটা দেখা মেলেনি শহীদ মিনারের সামনে।

তাই বলে শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে বাদ রাখেনি শিশুরা। নিজ-নিজ উদ্যোগে শিশুরা উঠানে তৈরি করেছে শহীদ মিনার। পাঠশালায় পড়–য়া শিশুরাও শহীদ মিনার বানাতে অংশ নিয়েছে। উঠানে তৈরি শিশুদের শহীদ মিনারগুলো ইট পাথরের তৈরি স্থায়ী মিনার না হলেও এসব শহীদ মিনারে ছিল শিশুদের সবটুকু ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর আন্তরিকতা। তিনটি কলাকাছ আর কিছু রঙিং কাগজ। তাই দিয়ে তৈরি ভালোবাসার শহীদ মিনার।

রবিবার সকালে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের মঙ্গলহোড় গ্রামে এমন কিছু শিশুকে নজরে পড়লো শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। উৎসহ, স্নেহা, স্নিগ্ধা, স্বাধীন,খাদিজা। ওদের বয়স ৭ থেকে ১০। প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ওরা। প্রতিবছর নিজ নিজ স্কুলে যায় ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। করোনা ভাইরাসের আক্রমনে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে স্কুল বন্ধ রয়েছে। এবার স্কুল বন্ধ থাকায় ওরা স্কুলের শহীদ মিনারে যেতে পারেনি। পারেনি ফুল দিতে। পারেনি প্রভাতফেরিতে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি ,আমি কি ভুলিতে পারি গানটি গাইতে। তাই ওরা তৈরি করেছে শহীদ মিনার। যথা সময়ে শ্রদ্ধার সাথে ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে। শহীদ মিনার তৈরিতে যে টাকা লেগেছে সেটাও বাবা-মায়ের কাছ থেকে ওরা নেয়নি। স্থানীয় দোকান কিছু কিনে খাওয়ার জন্য নেওয়া টাকা জমিয়ে ওরা শহীদ মিনার তৈরি করেছে। পাশের বাড়ি থেকে প্রত্যেকেই একটি করে গোলাপও সংগ্রহ করেছে। ওদের একজন একটি ফুলের স্টিকও কিনে এনেছে। ওদের ভাবনা নজর কাড়ার মতো।

স্নেহা বলেন, ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, জব্বারসহ অনেকে। তাদের রক্তে মায়ের ভাষা ফিরে পেয়েছে বাঙালি জাতি। একুশের এই দিনে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে আসছে দেশবাসী। স্কুল বন্ধ থাকায় আমরা শহীদ মিনারে যেতে পারিনি। তাই বাড়িতে শহীদ মিনার তৈরি করে শহীদদের স্মরণ করেছি।


ভাষার জন্য শহীদদের আত্মত্যাগের ইতিহাসও জানে শিশু-কিশোররা। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়–য়া উৎস বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি জড়িত একটি দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করেত গিয়ে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন অনেকে। এজন্য দিনটি শহীদ দিবস ’ এটা যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সেটাও উৎস’র জানা।

ওদের পাশেই আরেক মহল্লায় দেখা মিলল ইনছান নামের আরেক স্কুল পড়ুয়া শিশু তার সহপাঠী নিয়ে তৈরি করেছে আরেকটি শহীদ মিনার। কিছুদুরে দেখা গেল শিমুল নামের আরেকজন স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী তাদের উঠানে তৈরি করেছে শহীদ মিনার। ওর সহপাঠীরা ওই শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

শুধু উৎস, ইনছান বা শিমুল শহীদ মিনার তৈরি করেনি। স্কুল বন্ধ থাকায় পুরো জেলায় শিশুরা এবার উঠানে-উঠানে শহীদ মিনার তৈরি করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এসব শহীদ মিনারের বেশির ভাগ বানিয়েছে শিশুরা। জেলার বিভিন্ন এলাকায় উঠানে বানানো অস্থায়ী শহীদ মিনারগুলোকে ঘিরে শিশুদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।

পাথরাইল ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ চাঁন খা বলেন, শিশুদের এমন উদ্যোগ নজর কাড়ার মতো। শিশুদের এমন আগ্রহ দেশ ও জাতির প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

(মজলুমের কণ্ঠ / ২১ ফেব্রুয়ারি / কে.এ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles