শিক্ষা ক্যাডার না শিক্ষা সার্ভিস

।। মাছুম বিল্লাহ ।।

সরকারি কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের পদোন্নতিসহ সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ ও এর মাধ্যমে শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ক্যাডার বিলুপ্ত করে শিক্ষা সার্ভিস চালু করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষা সচিব মো. সোহরাব হোসেন। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখন যেমন জুডিশিয়াল সার্ভিস আলাদা রয়েছে, তাদের কোনো কিছুতে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ নেই। একইভাবে শিক্ষা সার্ভিস হলে সেখানে তাদের পদোন্নতির সুযোগ-সুবিধাসহ সব কিছুর আলাদা বিধান থাকবে।’ উদহারণ হিসেবে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে যেমন বিধান রয়েছে এমন হতে পারে। চাকরির অভিজ্ঞতা কত বছর হলে প্রমোশন হবে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রকাশনাসহ সার্বিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এমন হলে সমস্যা কাটতে পারে। তবে চাকরির সুযোগ-সুবিধা সাধারণত নির্ধারণ করা হয় তার কর্মপরিধি অনুসারে। এটি অনেক ক্ষেত্রেই অভিন্ন হবে না। তবে বিভিন্ন স্তরে বেতন কাঠামো অভিন্ন। তিনি বলেন, হাজার হাজার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা পদোন্নতি না পেয়ে অবসরে চলে যান। একসময় প্রশাসন ক্যাডারেও এ সমস্যা ছিল। তখন অনেক বেশি নিয়োগ হতো ফলে সবাইকে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হতো না। এখন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিটি বিসিএস-এ প্রশাসন ক্যাডারে কম নিয়োগ দেওয়া হয়।এক এক পেশার এক এক ধরন। এটিই স্বাভাবিক। এরশাদ আমলে আন্দোলনের সময় আমরা কয়েকজন ছাত্র পুলিশের হাতে বন্দি হয়েছিলাম। বললাম আমরা মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছি, একটি কলেজে আমার চাকরিও হয়েছে, কিন্তু যোগদান করব কি না, সেটি নিয়ে একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম। তার পরও আমাদের অ্যারেস্ট করা হলো। দেখলাম পুলিশ সারা রাত আমাদের গাড়িতে করে সিটি চষে বেড়াচ্ছে আর যেখানে যাকে পাচ্ছে গাড়িতে তুলছে, কারণ পরদিন হরতাল। দেখলাম বেশ আনন্দের সঙ্গেই তারা কাজটি করছে। আমাদের থানায় রেখে গভীর রাত পর্যন্ত সম্ভবত ভোররাত পর্যন্ত এ কাজটি তারা আনন্দের সফঙ্গ করছে। এ গভীর রাতে একজন শিক্ষক ঘুমিয়ে আছেন এবং পরদিন সকালে তিনি ক্লাস নেবেন, পরীক্ষা নেবেন। তার ঘুম দরকার। পুলিশ অফিসার ও তার সঙ্গের ফোর্স হয়তো সারা রাত অপারেশন চালিয়ে দিনে ঘুমাবেন। এভাবে যার চাকরির যে ন্যাচার… এটি একটি থেকে আর একটি আলাদা হবে। কিন্তু সম্মানের জায়গাটি এবং আকাশ-পাতাল ব্যবধানের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ক্যান্টনমেন্ট কলেজে যখন শিক্ষকতায় ঢুকলাম, তখন ক্লাস যেহেতু ইংরেজিতেই নিতে হতো, তো আমার শিক্ষার্থীরা বলত, ‘স্যার আপনি কেন আর্মিতে যাননি, এখনো যেতে পারেন শিক্ষা কোরে।’ তাদের পারসেপশন হচ্ছে শুধু আর্মি অফিসাররাই ইংরেজি বলতে পারেন! কাজেই যারা ইংরেজি বলেন তাদের তো আর্মি অফিসার হওয়া উচিত এবং হতে পারেন। কারণ, আর্মি অফিসারদের সম্মান, প্রতিপত্তি, ভাব-ভঙ্গি সবই অনেক উঁচুতে।

——

ক্যাডেট কলেজে গিয়ে দেখলাম যারা অধ্যক্ষ হন তারা শিক্ষা কোরের অফিসার, আর সিভিল শিক্ষকদের মধ্যে থেকে প্রমোশন পেয়েও কেউ কেউ অধ্যক্ষ হতেন। তবে চমৎকার একটি নিয়মানুযায়ী অর্ধেক অধ্যক্ষ সিভিল শিক্ষকদের মধ্যে থেকে হতেন, অর্ধেক বাহিনী থেকে হতেন। ওই সময়ে সেনা অফিসার যারা মোটামুটি তিন বছরের জন্য অধ্যক্ষ হতেন তাদের ভাবসাব পরিবর্তন হয়ে যেত। তারা যে, ইস্ট্রাক্টর ছিলেন বা আবার হবেন এসব অনেকেই ভুলে যেতেন। বর্তমানে অধ্যক্ষ শুধু শিক্ষা কোর থেকে নয়, যেকোনো কোর থেকে হতে পারেন এবং হচ্ছেন। তবে এখনো যেটি আছে, সেনা বিভাগের এডুকেশন ডাইরেক্টরেটের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একজন শিক্ষা কোরের অফিসার। এটি চমৎকার একটি নিয়ম। একইভাবে, মেডিকেল কোরের প্রধানও একজন ডাক্তার।আমাদের শিক্ষা প্রশাসনে কিছু সমস্যা আছে, তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত ধাপে ধাপে যেসব পরিবর্তন হয়েছে; সেগুলোকে আমরা পজিটিভলিই দেখতে চাই। এখন যে পর্যায়ে আছে সেখান থেকে আরো ভালো পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের দেশে নাকি মাত্র ১৭টি কলেজ সরকারি ছিল। তার মানে কী? শিক্ষা তখন রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য থেকে অনেকটাই বঞ্চিত ছিল। তবে শিক্ষা তখন অনেকটাই মানবিক ছিল, মানসম্পন্ন ছিল। ১৯৮০-৮২ সালের দিকে যখন মহাকুমার একটি পুরুষ ও একটি মহিলা কলেজকে সরকারি করা হলো তখন এর পরিধি বেড়ে গেল। এটি নিশ্চয়ই পজিটিভ দিক। তারপর এরশাদ আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক মন্ত্রী তাদের এলাকার কিছু কিছু কলেজ সরকারি করেছেন। এভাবে এলোমেলোভাবে অনেক কলেজ জাতীয়করণ করা হয়। যেভাবেই হোক এর পরিধি বাড়তে থাকল। বর্তমান সরকারের আমলে উপজেলা পর্যন্ত জাতীয়করণের সীমা চলে গেছে। যদিও এটি সব সমাধান নয়, কিন্তু আগাচ্ছে তো।কেউ কেউ বলছেন, সেনাশাসকরা জনপ্রিয়তার জন্য কয়েকটি নতুন ক্যাডার চালু করেন। আমার বিশ^াস এটি হয়তো প্রয়োজনেই করতে হয়েছিল। তাদের পূর্বে নাকি শিক্ষা সার্ভিস ছিল, ক্যাডার নয়। সরকারি কলেজের শিক্ষকরা পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রায় সমান বেতন পেতেন। সেটা নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন পিএসসির চেয়ারম্যান। পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমসসহ তুখোড় মেধাবীদের পছন্দের কয়েকটি ক্যাডার বাদে বাদ বাকিরা ক্যাডারের কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না বলে প্রায়ই পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়, পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকেই একই কথা হরহামেশাই শুনে থাকি। বাস্তবে ঘটছেও তো তাই। তাই সরকারি কলেজের শিক্ষকরা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতে, পরিচয় দিতে অধিকতর আগ্রহী। তারা শিক্ষার প্রশাসনিক পদগুলো পাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে লবিং করে থাকেন। একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে সরকার যখন উপজেলা ও জেলা শহরের সেরা কলেজগুলোকে জাতীয়করণ করছে, কতিপয় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা এর বিরোধিতা করছেন। কিন্তু তাদের খেয়াল করা উচিত যে, এতগুলো কলেজ সরকারি না হলে এত পদ থাকত না। আর এত পদ না থাকলে তারা কি শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হতে পারতেন!ব্রিটিশ রাজ যখন ভারতবর্ষ শাসন করত তখন তারা ভিনদেশি মানুষের সংস্কৃতি ও কালচার বুঝে, মানুষের সাইকোলজি বুঝে কীভাবে তাদের শাসন করতে হবে, কীভাবে অন্য কালচারের লোক হিসেবে এখান থেকে বেনিফিট নিতে হবে; সেজন্য সিভিল সার্ভিস চালু করেছিল। যার জের এখনো আমরা প্রশাসন ক্যাডার নামক বিষয়টিতে দেখতে পাই। সার্বিক প্রশাসন একটি থাকতে পারে, কিন্তু সেটি সব ক্যাডার থেকে আলাদা হতেই হবে এমনটি কেন?স্বাস্থ্য ক্যাডারে যিনি সচিব হবেন, তিনি একজন ডাক্তার হবেন, শিক্ষা ক্যাডারে যিনি সচিব তিনি একজন প্রকৃত শিক্ষক হবেন। কারণ শিক্ষা প্রশাসন আর পুলিশ প্রশাসন এক নয়, শিক্ষা প্রশাসন আর কৃষি প্রশাসনও এক নয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হবে একজন কৃষিবিদ। তাতে সমস্যা কোথায়? প্রশাসন চালানোর জন্য তাদের অতিরিক্ত যে যোগ্যতা বা নতুন কিছু দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন; সেটি তারা পেশাগত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ‘পিএটিসি’ থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করতে পারেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে, প্রশাসন ক্যাডার মনে করে শিক্ষকরা, প্রকৌশলীরা কিংবা কৃষিবিদ ও ডাক্তাররা প্রশাসন বুঝেন না। তাই তারা মাঝে মাঝে বলে থাকেন বা চেষ্টা করেন যে, শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রশাসনিক পদগুলোতেও তারা বসবেন যেমন মহাপরিচালক, পরিচালক, উপপরিচালক, চেয়ারম্যান, অধ্যক্ষ। প্রশাসন মানে কি শুধু ফাইলপত্র গোছগাছ রাখা, নির্দেশ প্রদান করা, বিশেষ কিছু ভাষা ব্যবহার করা আর স্মার্টনেস দেখানো? প্রশাসন হতে হয় জনবান্ধব, বিশেষায়িত এবং দেশপ্রেমমূলক। ব্রিটিশ বা পাকিস্তানিরা যা সৃষ্টি করে গেছে, সেই সময়ে হয়তো সেগুলো ঠিক ছিল, কিন্তু এখন আমরা স্বাধীন দেশে বাস করি, নিজেদের ভাগ্য, নিজেদের দেশ নিজেদেরই গড়তে হবে। অতএব প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখনো ব্রিটিশ কিংবা পাকিস্তানি আমলের মতো হতে হবে এমনটি বোধহয় ঠিক নয়।একজন মেধাবী শিক্ষকের ক্যারিয়ার পথ উন্মুক্ত রাখতে হবে, এটি কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য নয়, দেশের স্বার্থে, শিক্ষার কল্যাণেই এটি করতে হবে। তাই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ঢুকেন তার সিঁড়ি থাকতে হবে যাতে তিনি মাধ্যমিকের শিক্ষক, কলেজের শিক্ষক, বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদটিতে যেতে পারেন। এটি হবে প্রকৃত জনবান্ধব, দেশপ্রেমমূলক আর পেশাগত কল্যাণধর্মী ব্যবস্থা। বর্তমানে শিক্ষকদের এ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা হচ্ছে না কেন? কারণ হচ্ছে বর্তমানে শিক্ষা প্রশাসনে যারা আসেন, তারা অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় আসেন। কার কী যোগ্যতা আছে বা নেই সেটি দেখা হয় না। এত বিশালসংখ্যক শিক্ষকের মধ্যে পুরোটা হয়তো দেখাও যাবে না তারপরও মিনিয়াম একটি স্ট্যান্ডার্স রক্ষা করা যেত একটু খেয়াল করলে। আর এসব কারণেই প্রশাসনের লোকজন মনে করেন, শিক্ষা বিভাগে যারা আছেন তারা শিক্ষা প্রশাসনের জন্য উপযুক্ত নন। বিষয়টি আসলে তা নয়। বিশেষ কিছু ক্যাডার চোখে লাগার মতো সুযোগ-সুবিধা ও গুরুত্ব পায় বলে আমাদের দেশের অনেক মেধাবী প্রকৌশলী, ডাক্তার, কৃষিবিদ ওইসব সুবিধাপ্রাপ্ত ক্যাডারে চলে আসছেন। ফলে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞানের সুবিধাপ্রাপ্তি থেকে। সৃষ্টি হচ্ছে এক অসমতা ও বৈষম্য। তাছাড়া তাদেরকে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ওইসব বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করানো হয়েছিল, সেই অর্থের অপচয় হচ্ছে। আর যারা চলে আসতে পারছে না তারা এক ধরনের মানসিক অশান্তি ও অতৃপ্তি নিয়ে কাজ করেন। ফলে তাদের উপযুক্ত সার্ভিস থেকে দেশ ও জাতি বঞ্চিত হচ্ছে। এসবের অবসান হওয়া প্রয়োজন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে।লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকmasumbillah65@gmail.com

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ৬ ফেব্রুয়ারি / আর.কে.)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles