নারীর দুঃখগাঁথা

।। মোঃ আবু হাসান তালুকদার।।

একটা দেশের উন্নতি হল কি হল না তা যা দিয়ে মাপা হয় তার নাম জিডিপি বা গ্রস ডমেস্টিক প্রডাক্ট। একটি দেশের এক অর্থ বৎসরে যত ধরণের ও যত পমিাণের পণ্য উৎপাদিত হয়, সেবা প্রদান করা হয় বা কাজ করা হয় তার আর্থিক মূল্যের সমষ্টিই হল জিডিপি। জিডিপি হিসাবায়ন একটি জটিল প্রক্রিয়া। কোন্ জিনিস এখানে অর্ন্তভুক্ত হয়নি? চারিদিকে তাকালে মনুষ্য তৈরি যা দেখি সবই। জুতার শুক তলি, শার্টের বোতাম হতে শুরু করে বিশাল জাহাজ নির্মাণ, ধোপা-নাপিত হতে শুরু করে কৃষক-শ্রমিক, ডাক্তার-প্রকৌশলীর শ্রমমূল্য বা বেতন সবই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বিশাল এই তালিকার মধ্যে এমন একটি নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি যাকে ছাড়া সমাজ-সংসার অচল। এই নামটি হল গৃহিনী। অর্থাৎ গৃহিনীর গৃহস্থলি কাজ। জিডিপিতে এই কাজের মূল্য ধরা হয়নি। অর্থাৎ একজন গৃহিনী মাথার ঘাম পায়ে ফেলে স্বামী-সন্তান পরিবারের জন্য যে কাজ তার কোন আর্থিক মূল্য নেই। তার সারাদিনের-সারাজীবনের কাজ ষোল আনাই মিছে। নারীর দুঃখগাঁথা শুরু এখান থেকেই।

সকল পেশা বা কাজের নির্দিষ্ট একটি নাম আছে। কিন্তু নারী নিজ ঘরে যত কাজই করুক না কেন তা কোন পেশার মধ্যে পড়ে না। যদিও পেশা নামক স্থানে আমরা গৃহিনী শব্দটি লিখি। গৃহিনী কি আসলে কোন পেশার নাম? অথচ গভীরভাবে একটু ভাবলেই বুঝতে পারবো গৃহিনীর আড়ালে একজন নারী কতজন পেশাজীবির কাজ করে থাকে। বাবুর্চির মত রান্না-বান্না করা, আয়ার মত সন্তান লালন-পালন ও শুশ্রষা করা, ধোপার মত কাপড় ধোওয়া, শিক্ষকের মতো বাচ্চাদের পড়াশুনা করানো, বাড়ীর কেয়ারটেকারের দায়িত্ব পালন করা, বাড়ীঘর পরিস্কার পরিছন্ন করা, বাজার করা, সামাজিকতা রক্ষা করা, আত্মীয় স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, পরিবারের পরামর্শক, স্বামীর বন্ধু, জীবনসঙ্গী-শয্যাসঙ্গী ইত্যাদি আরো কত কাজ করে থাকে একজন গৃহিনী। অথচ প্রতিটি কাজের জন্য পেশাজীবী নিয়োগ করলে তার শ্রমমূল্য বা বেতন কিন্তু ঠিকই জিডিপিতে অর্ন্তভুক্ত হতো।

জিডিপির মত জটিল বিষয় না হয় বাদ দেয়া হল, একজন স্বামী কি গৃহিনীর কাজের মূল্যায়ণ করে থাকে? তার কাজের অর্থ মূল্য প্রদান করে? সাধারণত যেসকল স্ত্রী চাকুরি করে বা নির্দিষ্ট পেশার সাথে জড়িত তাদের আয়কে মূল্যায়ণ করা হয়। গৃহিনীর কোন আর্থিক স্বাধীনতা নেই। স্বামী যেভাবে নাচায় সেভাবেই নাচে। কোন কোন স্বামী নারীকে টাকা কড়ি ঠিকই দেয় কিন্তু মাঝে মধ্যে বুঝিয়ে দিতে ভুলে না যে এটা ভালবাসার আড়ালে এক ধরণের দয়া। লাটাই হাতে রেখে ঘুড়ির স্বাধীনতা দেওয়া আর কি! টাকা কড়িও না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু সংসারে কোন সমস্যার সৃষ্টি হলেই স্বামী মহাশয় যখন হংকার দিয়ে বলে, সারাদিন ঘরে বসে থেকে কি কর? তখন নারী এ দুঃখ কোথায় রাখে?

এ তো গেল অনেক প্রকার কাজ করেও গৃহিনী নামক বেকার নারীর কথা। এখন আসি আমি বাইরের গৃহিনী বা চাকুরিজীবি নারীর কথা। সাধারণত সবাই ধরে নেয় যে সংসারে স্বামী-স্ত্রী দুই জনে চাকুরী করে তাদের সংসার কতই না সুখের। এ ধরণের সংসারে একটু অশান্তি হলেই আমরা ভাবি- সুখে থাকতে ভুতে কিলায়। ইঙ্গিতটি কিন্তু নারীর দিকেই। আসলে কি তাই?

নারী মাত্রই জন্মগত বা প্রাকৃতিকভাবেই ঘর কেন্দ্রীক। তাই নারী যখন কর্মস্থলে বা বাইরের জগতে যায় তখন সবই তার প্রতিকূল পরিবেশ। অনেক হিসেব নিকেশ করে চলতে হয়। চাকুরি করতে গেলে অনেক পুরুষ সহকর্মী বা ক্লায়েন্টের সাথে প্রতিনিয়ত কথা বলতে হয়। সেই কথা বলা বা মেশার মাত্রা যদি হেরফের হয় তবেই সর্বনাশ। যদি কম হয় তবে কেউ দোমাগী বা অহংকারী বলে দুরে সরিয়ে রাখবে। কেউ কেউ টিপ্পনী কাটবে- নাচতে এসে আবার ঘোমটা। আর যদি বন্ধু সুলভ মনোভাব নিয়ে একটু বেশী মিশে তবে ভাববে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছি। হাসি হাসি ভাব দেখলে অণ্য রকম ইঙ্গিতে মনে করবে। ভাবখানা এমন ইচ্ছে করলেই যা খুশি তা….

বাইরের মানুষ সে তো বাইরেরই মানুষ, যা ভাবে ভাবুক। কিন্তু নিজের পুরুষ মানুষ? অফিসে কোন কাজে বা মিটিং এর কারণে বাসায় ফিরতে দেরী হলে নারীকে স্বামীর বা পরিবারের বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। যা এক সময়ে সন্দেহ বা মনোমালিন্য পর্যন্ত গড়ায়। একে তো অফিসের অতিরিক্ত কাজে ক্লান্ত, কোথায় একটু শান্তি পাবে। তা না, উল্টো বাসায় ফিরতে হয় মাথা নীচু করে। যেন কোন অপরাধ করে এসেছে। অথচ অফিসের এই বিলম্ব যদি স্বামীর ক্ষেত্রে ঘটে তখন ভাবখানা এমন যেন দ্বিগীজয় করে এসেছে। অন্য দিনের চেয়ে সেদিন তার বিশেষ খাতির যতœ করতে হয়।

স্বামী যদি বাসায় অফিসের কলিগ বা বন্ধু বান্ধবের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা বলে বা ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকে তা হলে কিচ্ছু না। এটা তার পপুলারিটি বা গুড ইমেজ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই কাজ একজন নারী করলে তার সংসার টিকে রাখাই মুশকিল। ভাবখানা এমন যেন, নারীর তো বিয়ের পর বন্ধু বান্ধব থাকতে নেই। সুখ-দুঃখ শুধুই স্বামীর সাথে শেয়ার করতে হবে। কিন্তু তার নিজস্ব পুরুষটি জানে না নিজস্ব ছাড়াও আরও কিছু থাকে।

কর্মক্ষেত্রে স্বামীর চেয়ে যদি স্ত্রী বেশি সফলতা পায় তবেই শুরু হয় ব্যক্তিত্বের দ্বন্ব। এই নিরব যন্ত্রনায় কত নারী যে শেষ হয়েছে সে খবর কে রাখে। পুরুষ নারীকে অধঃস্তন দেখতেই পছন্দ করে। চাকুরিজীবি স্বামী-স্ত্রী একসাথে বাসায় ফিরলে স্বামী কাপড় পাল্টিয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় আরাম-আয়েশের জন্য। আর স্ত্রী বেচারীর ছুটতে হয় রান্না ঘরে অথবা সন্তানদের যতœ নিতে। আসলে একজন নারীর কোন ছুটি নেই।

চাকুরীজীবী নারীরা তো তবুও ভাগ্যবান যে তারা চাকুরী করে। কিন্তু সবোর্চ্চ ডিগ্রি নিয়েও যখন স্বামীর বা স্বামীর পরিবারের মানসিকতার কারণে ঘরে বসে থাকতে হয় নারীকে। বিয়ে করে বিসর্জন দিতে হয় তার স্বপ্ন, আশা-আকাঙ্খাকে। প্রতিভাবান হওয়া সত্তে¡ও বাধ্য হয়ে চার দেয়ালের মধ্যে কর্ম-বিমুখ এবং পর নির্ভরশীল হয়ে জীবন যাপন করতে হয়। নারীর স্বপ্ন ভঙ্গের এই দুঃখ বোঝে কয়জনে?

যে সন্তান লালন পালন করার জন্য একজন নারী তিল তিল করে ক্ষয় করে তার শরীর ও মন। কোন কারণে স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য বা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে স্বামী এমনভাব করে যেন সন্তান শুধুই তার একার। বংশের বাতি। অথচ যে নারী সন্তান ধারণ করলো জন্ম দিল, লালন-পালন করলো, তার যেন সন্তানের উপর অধিকারই নেই। উনিশটি হাড় একসাথে ভেঙ্গে যাওয়ার কষ্টের সমপরিমাণ প্রসব বেদনার কষ্ট পুরুষ বুঝবে কি করে?

একজন কন্যা শিশু যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে, মা-বাবা ও আপনজনের আদর ভালোবাসায় বড় হয়, যে বাড়ীর পরতে পরতে তার শৈশব-কৈশরের স্মৃতি জড়িত, বিয়ের পর জানতে পারে মা-বাবার এই ঘর নাকি তার আপন নয়। স্বামীর বাড়ীই তার আপন ঘর। মা-বাবার সংসারে সে নাকি কিছু দিনের মেহমান। তাই বুকের সব কষ্ট ভুলে তিল তিল করে গড়ে তোলে আপনঘর অর্থাৎ স্বামীর ঘর। কিন্তু আপন ঘরটি তার কতটুকু আপন তা স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হলেই টের পায়। কোথায় তোমার ঘর গো নারী, কোথায় তোমার ঘর….

পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি, লালসা, ইভটিজিং এর প্রতিনিয়ত শিকার হয় মেয়েরা। পথভ্রষ্ট নারী-পুরুষ পাপাচারে বা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। কিন্তু ফতোয়া জারী হয় শুধু নারীর বেলায়।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা বিভিন্নভাবে শোষিত বঞ্চিত, নিগৃহীত অথবা নির্যাতিত হচ্ছে। নারী স্বাধীনতার কথা বললেও নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা আছে কি? আর অধিকার? পিতা-মাতার সম্পত্তিতেই তো নারীর পূর্ণ অধিকার পায় না। হিন্দু ধর্মে তো নারীরা উত্তরাধিকার হয় না। কোন কোন ধর্মে তো আবার নারীকে শয়তানের প্রতিভূ, নরকের দ্বার বিবেচনা করা হয়।

নারীর সফল ভূমিকার কারণে একটি পরিবার তথা পারিবারিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এটা মানতে সমাজের মানুষ এখনো নারাজ। নিমাই ভট্টাচার্যের লাল মেম সাহেব আমাদের সমাজেও আছে কিন্তু আমরা তার খোজ রাখি না। একজন নারীর ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও পরিশ্রমের কারণে একজন পুরুষের অনেক বড় হওয়ার কাহিনী হল এই লাল মেম সাহেব উপন্যাস।

নারী মা, নারী কন্যা, নারী স্ত্রী/প্রেয়সী, নারী বোন, খালা, ফুফু। সকল ভালবাসার উৎস হল নারী। তাই নারীর অবহেলা মানে নিজের ভালবাসাকেই অবজ্ঞা করা। তাছাড়া মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক হচ্ছে নারী। তাই এই অর্ধেককে দমিয়ে রেখে কখনোই উন্নতি সম্ভব নয়। আমাদের শিশুদের শারিরীক ও মানসিক বিকাশে এবং একটি শান্তিময় পরিবার ও একটি আদর্শ সমাজ গঠনে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিগতভাবেও নারী পুরুষ একে অপরের মুখাপেখী। সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মানের জন্য অবশ্যই নারী পুরুষ একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তো কবি বলেছেন, “পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।”

লেখক: মোঃ আবু হাসান তালুকদার
উপ-মহাব্যবস্থাপক, অগ্রণী ব্যাংক

Related Articles