বসন্তে প্রকৃতি ও মন !

মো: আবু হাসান তালুকদার

সময়ের আবর্তে পড়ে দিনের পর দিন মাসের পর মাস পেরিয়ে বছরের শেষে আসে ঋতু রাজ বসন্ত। প্রকৃতি তাকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে পাখির কলতানে মূখরিত করে বরণ করে নেয়। রাজার আগমনে যেমন চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়ে যায় তেমনি বসন্তের আগমনে প্রকৃতিও নতুন সাজে সেজে উঠে। প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দেয় প্রকৃতিতে। বসন্তের ছোঁয়ায় শীতের খোলস ছেড়ে ফুলে ফুলে ভরে উঠে বৃক্ষরাজি। শিমুল, পলাশ, পারুল, কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার লাল রংয়ে রঙিন হয়ে উঠে গ্রামের পর গ্রাম, বন-বাদার, বাগ-বাগিচা। তাদের প্রস্ফুটিত হাসিতে মনে হয় যেন বনে লেগেছে আগুন রঙের খেলা। আর নিচে গাঁদা ফুলের হলুদ আর বাসন্তী রং ছাড়াও লাল, নীল, বেগুণী, গোলাপী, সাদা, খয়েরী হরেক রঙের ফুলের সমাহার। মাঠে-ঘাটে পা ফেলতে হয় সাবধানে। কারণ ওখানেও যে ফুটে আছে ঘাস আর গুল্ম ফুল। শুকিয়ে যাওয়া জলাশয়ে কলমি ফুল জানান দেয় তারাও পিছিয়ে নেই। প্রকৃতি এখন রঙিন সাজে সজ্জিত। যেন রূপের আগুনে পুড়িয়ে দিবে প্রেমিক মনকে। মিষ্টি সুবাতাসে মৌ মৌ করে চারপাশ। ফুলের এই রূপে ও গন্ধে মাতাল হয়ে যায় মধুমক্ষী, পাখি আর পতঙ্গেরা। মৌমাছির গুঞ্জনে মূখরিত ফুল বাগান। ফুলে ফুলে বসে আর মধু পান করে। মধু পানের সময় সাথে নিয়ে যায় ফুলের পরাগ রেনু। বসে অন্য ফুলে। হয়ে যায় পরাগায়ন। ফুলে ফুলে মধুর মিলন। আ¤্র কাননে মধু পিয়াসীদের আনন্দতো আর ধরে না। ডালে ডালে পুঞ্জিত আ¤্র মকুল। মৌমাছির গুঞ্জুরি যেন সুরেলা সঙ্গীত। গাছে গাছে পাখির কিচির মিচির জানান দেয় ওদের আনন্দের উচ্ছ্বাস। মনে হয় খাঁচা থেকে সদ্য মুক্তি পেয়ে ওরা এখন মুক্ত বিহঙ্গ। মাঠে-ঘাটে মনের আনন্দে উড়ে বেড়ায় ফড়িং আর রঙ্গিন প্রজাপ্রতিরা।

 বসন্তে পাখিরা যত ডাকে, গান গায়, অন্য ঋতুতে কিন্তু তা দেখা যায় না। আর কোকিলতো বসন্তেরই পাখি। গাছের মগডালে নিজেকে আড়াল করে কুহু কুহু রবে গান গেয়ে ওঠে কোকিল। কোকিলের গানে বিমোহিত হয়ে যায় মানুষের মন। বিরহীর মন উতালা করে কোকিলের এই কুহুতান। বসন্তের প্রাকৃতিক বৈচিত্রতা যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে কবি হৃদয়কে। বসন্ত এলেই  বাঙ্গালীর মনে পড়ে যায় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের সেই পরিচিত গান, “আহা আজি এই বসন্তে, এত ফুল ফোঁটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়……।”

বসন্তের আগমনে প্রকৃতিতে যেমন দোলা লাগে তেমনি মানব মনেও দোলা লাগে। মন ভালো লাগায় ভরে যায়। কবিগুরু তো রাখঢাক না করেই বলে দিয়েছেন “ফুলের বনের যার পাশে যাই তারেই লাগে ভাল।” শুধু ভাললাগা নয় ভালবাসতে ইচ্ছে করে। প্রিয়জনের সাথে মিলনের সাধ জাগে। যে কথা হয়নি বলা তা বলতে ইচ্ছা করে। ভীরু প্রাণে কেবলই বাজে- মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে/ মধুর মলয় সমীরে মধুর মিলন রটাতে….।

বসন্ত এলে প্রকৃতিতে লাগে পরিবর্তনের ছোঁয়া। শীত নিদ্রা শেষে আড়মোড়া ভেঙ্গে যেন জেগে ওঠে প্রকৃতি। শুরু হয় নতুন সময় নতুন ভাবে। শীতের সময় পাতা ঝরে যে গাছ ন্যাড়া হয়েছিল তাতে জাগে প্রানের স্পন্দন। নতুন নতুন কচি পাতায় ভরে যায় বসন্তের আগমনে। সবুজ সবুজ এই কচি পাতায় পড়ন্ত বিকেলের আলোর নাচন যেন মানব মনেও নাচন ধরিয়ে দেয়। আলো ছায়ার লুকোচুরিতে মনটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। বসন্তে প্রকৃতি দখিনা দুয়ার খুলে দেয়। হালকা হিমেল বাতাসে মন প্রাণ জুড়িয়ে যায়। মৃদু বাতাসের ছোঁয়ায় গাছের শুকনো  পাতা পড়ার মর্মর শব্দেও নিঃশব্দ রাতে শিহরণ জাগায়। বসন্তের বাতাসও যেন শরীরে ভালবাসার পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায় । মনে হয় দূর হতে প্রিয়জনের স্পর্শ নিয়ে এসেছে। মন আনচান করে দেয়। তাইতো বাউল কবি গেয়ে উঠে- “বসন্ত বাতাসে সই গো/ বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে…..।” কবি বেগম সুফিয়া কামালের এমনই দিনে “ তাহারেই পড়ে মনে।”

বসন্তের রূপ লাবণ্যে ভরা মনোহর পরিবেশ আর উদাসী হাওয়ায় বিরহী মনতো আর ঘরে থাকে না। কবি শহীদুল ইসলাম প্রামানিক এর ভাষায়- শিমুল ডালে রাঙা ফুলে বসন্তেরি আগমন/ এমন দিনে বন্ধু বিনে ঘরে কি আর থাকে মন/ পুবাল হাওয়ায় মন উতালা-নেচে উঠে কি সূখে/ বসন্তেরি লাগল হাওয়া পরশ পাওয়া এই বুকে/গাছের ডালে পাতায় পাতায় বাতাসেরি হয় রণন/ এমনি দিনে বন্ধু বিনে ঘরে কি আর থাকে মন।

গানের ঋতু বসন্ত। কবিতার ঋতু বসন্ত। ভাল লাগার ঋতু বসন্ত। ভালবাসার ঋতু বসন্ত। প্রিয়জনকে কাছে পাওয়ার সুখ বসন্ত। মিলনের ঋতু বসন্ত। মনে রং লাগার ঋতু বসন্ত। বসন্ত হরণ করে না, শুণ্য হৃদয় ভরিয়ে দেয়। প্রকৃতিতে যেমন চলে মধুর বসন্তের সাজ সাজ রব। তেমনি নারী মধ্যেও। নারীও নাকি প্রকৃতির মত। যেখানে প্রকৃতি সুন্দর সেখানে নারীও সুন্দর। তাইতো বাসন্তী সাজে নারীকে যত ¯িœগ্ধ লাগে অন্য কোন সাজে তা লাগে না। নারীর খোপায় গোঁজা বসন্তের ফুল তো যেকোন অংলকারকে হার মানায়।

উৎসব পাগল বাঙ্গালীর তো পহেলা ফাল্গুন এলেই মনে বসন্তের রং লাগে। বিশেষ করে তরুন-তরুনীর মনে। শুরু হয় বসন্ত উৎসব। একান্তই বাঙ্গালী উৎসব। কবিতা, গান আর নাচের আয়োজন থাকে সারাদেশে। বাসন্তী রংয়ের শাড়ী পরিহীতা তরুনী-কিশোরীর পদচারণায় মূখরিত সর্বত্র। শিশুদেরও পরানো হয় বাসন্তী পোষাক। তরুনেরা পড়ে রঙ্গিন পাঞ্জাবী-পাজামা। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাদের সরব উপস্থিতি, পার্ক, রাস্তায় ঘুরাঘুরি মনে হয় যেন প্রজাপতির মেলা। এদিন যেন- কারো হারিয়ে যাবার নেই মানা।

বর্ষ পরিক্রমায় বিভিন্ন ঋতুর আগমন সৃষ্টির একটি স্বাভাবিক খেলা। বিভিন্ন ঋতু প্রকৃতিতে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়। ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে যায় মানুষের জীবনযাত্রা। কিন্তু মানুষের মনের পরিবর্তন ঘটায় যে ঋতু তা হচ্ছে বসন্ত। হৃদয় স্পর্শ করে বসন্ত। এজন্যই তো বিশ্বব্যাপী ভালোবাসার অপর নাম বসন্ত।

লেখক: মো: আবু হাসান তালুকদার
উপ-মহাব্যবস্থাপক, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড

 

(মজলুমের কণ্ঠ /১১মার্চ / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles