মজিরনদের মতো মানুষের পাশে দাঁড়াবে কে ?

কাওছার আহমেদ: 

বিশেষ প্রতিবেদন : মজিরন বেগম। বয়স পয়ষট্টি ছুঁইছুই। জন্মের পর থেকে অভাব তার পিছু ছাড়েনি। পাঠশালাতে যাওয়ার বাগড়া হয়েছে দারিদ্রতা। ফলে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছেল অল্প বয়সেই। স্বামীর সংসারও ছিলো অসচ্ছলতার চাদরে ঢাকা। স্বামীর দিন মজুরের পয়সায় চলে তাদের ছোট্ট সংসার। অসুস্থতার কারণে তার স্বামী নিয়মিত কাজ করতে পারেনি। গত ২০ বছর যাবত মজিরন বেগম নিজেই পানের দোকান করে সংসারের হাল ধরেছেন। সংসার চালাতে তিনি টাঙ্গাইল পৌরসভার সামনে ড্রেনের উপর ছোট্ট একটি অস্থায়ী পানের দোকান করেন। তার দোকানের আয় দিয়েই চলে ছয় সদস্যের পরিবার। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা এই মজিরন টাঙ্গাইল পৌরসভার কাগমারী এলাকার আব্দুল খালেকের স্ত্রী।

কথা হয় মজিরনের সাথে। তার জীবন সংগ্রামের কথা ভাগ করে দেন মজলুমের কণ্ঠের সাথে। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে একই এলাকার আব্দুল খালের সাথে তার বিয়ে হয়। ৪ শতাংশ জমি তাদের সম্বল। বৃষ্টির সময় ঘরে চাল দিয়ে পানি পড়ে। বন্যার সময় পাশের সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজে থাকতে হয় তাদের। অভাবের সংসারে দিন মজুর খালেকের আয়ে চলতে থাকে তাদের দুজনের পরিবার। পরবর্তীতে তার সংসার আলোকিত করতে আসে তার ৪ ছেলে ৫ মেয়ে। ইতিমধ্যে তিন ছেলে ও দুই মেয়ে মারা গেছে। মারা যাওয়া দুই মেয়ের আবার প্রত্যেকের এক ছেলে এক মেয়ে মোট চার নাতি নাতনি রয়েছে। মেয়ের জামাই ভড়ণপোশন না করায় নাতি নাতনিকে বাড়িতে তিনি দেখা শোনা করেন তিনি। এ ছাড়াও বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের আসা-যাওয়াতো আছেই। তার স্বামী ইতিমধ্যে তিনবার স্ট্রোক করেছেন। অপর দিকে তার বড় ছেলে হাসমত আলী কসাই এর কাজ করে। ১০ বছর আগে বিয়ে করে পৃথক হয়েছে। তার ঘরেও রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের ঘরের নাতি নাতনিকে সহযোগিতা করে না তার ছেলে। তাই তিনি পরিবারের হাল ধরতে প্রায় ২০ বছর যাবত টাঙ্গাইল পৌরসভার সামনে পানের দোকান করে সংসারের হাল ধরেছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, তার পানের দোকানের ছাদ নেই, নেই চারিদিকে কোন দেওয়াল। বসার জন্যও নেই কোন সুব্যবস্থা। রোদ বৃষ্টি তার মাথার উপরেই পড়ে। এ ছাড়াও চলন্ত যানবাহনের ধুলবালিও তার শরীরে লাগে। এ ছাড়াও রয়েছে শব্দ দূষণ। তিনি টাঙ্গাইল পৌরসভার সামনে ড্রেনের উপর বসে খুবই ছোট্ট একটা বাক্স নিয়ে পানের দোকান করছে। মাথার উপরে রোদ লাগায় বিদ্যুতের খুটির পাশে বসে রয়েছে। এক কথায় তিনি খুব কষ্ট করেই দোকান করেন।

মজিরন বেগম বলেন, ‘এ জীবন থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল। বাবার সংসারে কষ্ট করেছি। স্বামীর সংসারেও তেমন সুখ ও শান্তি ভোগ করতে পারিনি। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়। গত সাত বছর যাবত সিগারেট কোম্পানীর কাছ থেকে ছাতা দাবি করছি। তারা কোন প্রকার সাড়া দেয়নি। রাগ করে মাঝখানে তাদের কাছ থেকে সিগারেট রাখা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আবার রাখা শুরু করেছি। দোকানের কোন ছাউনি না থাকায় রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজতে হয়। পাশে বিদ্যুতের খুঁটির কারণে রোদ থেকে কোন রকম রক্ষা পাওয়া যায়। বৃষ্টি নামলে প্লাস্টিকের কাগজ মাথায় দিয়ে দোকান করি। মাঝে মাঝে শরীরও খারাপ করে। তারপরও অসুস্থ শরীর নিয়ে পেটের দায়ে দোকান করতে হয়। একটি ছাতার জন্য অনেকের ধারে ধারে ঘুরছি পাইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার চালান খুব কম। তাই কম কম পান সিগারেট রাখি। আগে এই দোকান থেকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হতো। এখন প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে আমাদের ৬ জনকে খুব কষ্ট করে চলতে হয়। কাউন্সিলর ও মেয়র কম্বল, চাল, ডালসহ অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু আমার ভাগ্যে ঝোটেনি। শহরের অলিতে গলিতে ছোট্ট একটা দোকান হলে আমার একটা ঠিকানা হয়। আমার পরিবারের জন্য অনেক উপকার হবে।

তার দোকানের ক্রেতা মো. ফটিক মিয়া বলেন, ‘পানের দোকান অনেককেই করতে দেখি। কিন্তু তার মতো এতো কষ্ট কাউকে করতে দেখিনি। খুব কষ্ট করে দোকান করে, সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা দিলে তার উপকার হবে।’

অপর ক্রেতা হারুন মিয়া বলেন, ‘তিনি রোদে পুড়ে, ‘বৃষ্টিতে ভিজে যেভাবে কষ্ট করে দোকান করে। একটা পুরুষ মানুষও এতো কষ্ট করতে পারবে না।’

টাঙ্গাইল পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফারুক হোসেন বলেন, ‘মজিরন বেগমের সাথে কথা বলে তার চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করবো।’

পৌরসভার মেয়র এসএম সিরাজুল হক আলমগীর বলেন, ‘বিষয়টি আমি দেখবো।’

(মজলুমের কণ্ঠ /৮মার্চ / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles