মানুষের সেবা করতেই তানভীনের মেডিকেলে পড়া

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আমি ছোটবেলা থেকেই বেশ উচ্চাকাক্সক্ষী ছিলাম। ভাবনা ছিল কিভাবে মানুষের সেবা করা যায়। অনেকেই পাইলট ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখাতো। কিন্তু আমার ভাবনা ছিল মাঠ পর্যায়ে কিভাবে মানুষের পাশে থেকে তাদেরকে সহযোগিতা করা যায়। তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেই চিকিৎসক হওয়ার। আজ আমার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে। কথাগুলো বলছিলেন মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের মধ্যে দ্বিতীয়স্থান অধিকার করা তানভীন আহমেদ। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার নলুয়া আড়ালিয়াপাড়া এলাকার তানভীন এসব কথা বলেন।

তানভীন আহমেদ জেলার সখীপুর উপজেলার পাহাড়কাঞ্চনপুরের বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তিনি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছেন। তার রোল নম্বর ১৪০৬২১২। তার মোট প্রাপ্ত নাম্বার ২৮৭।

জানা যায়, তানভীনের বাবা শাহজাহান বিমান বাহিনী থেকে অবসরে গেছেন। মা পারভীন বেগম গৃনিহী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তানভীন সবার বড়। তানভীন ঢাকার কুর্মিটোলা এলাকায় সিদ্দিক মেমোরিয়াল কিন্ডারগার্টেন থেকে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫, সখীপুর বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং একই কলেজ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। ছোট ভাই তাহসিন একই বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণী ও বোন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। বাবা শাহজাহান চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার তশড়া গ্রামে না গিয়ে তিনি সখীপুরের নলুয়া আড়ালিয়াপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন। পরে তানভীনকে বিএএফ শাহীন কলেজের ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। তানভীনের ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল অসহায় মানুষদের কিভাবে সাহায্য করা যায়। সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই ছোটবেলার স্বপ্ন আজ তানভীনের বাস্তবায়নের পথে। তার এই কাক্সক্ষীত ফলে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক ও সহপাঠীরা বেশ আনন্দিত।

তানভীন আহমেদ বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকেই অসহায় মানুষদের সাহায্য-সহযোগিতা করার ইচ্ছা ছিল। অনেকেই পাইলট ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখাতো। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিল দেশের অসহায় মানুষের পাশে থেকে তাদেরকে সাহায্য করার। চিকিৎসক হলে মাঠ পর্যায়ের মানুষদের সহযোগিতা করা যাবে। সেই ভাবনা নিয়েই বাবা-মায়ের উৎসাহে আমি এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিই। বাবা-মায়ের দোয়া ও আল্লাহ তায়ালার রহমতে আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য প্রথম পর্যায়ে দিন-রাতে ৬ ঘণ্টা করে পড়াশোনা করতাম। পড়াশোনার পাশিপাশি নিয়মিত নামাজও পড়তাম। আর পরীক্ষার কাছাকাছি দিন-রাতে ১২ ঘণ্টা করে পড়াশোনা করেছি। পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রায় ৮ মাস কোচিং করেছি। আসলে মানুষের ইচ্ছা শক্তিই বড় শক্তি। ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকলে অনেক বড় হওয়া যায়। কলেজের শিক্ষকরাও আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছেন। তাদের এ উৎসাহ ও শ্রম ভুলবার মতো না।’

তানভীনের বাবা শাহজাহান বলেন, ‘আমি বিমান বাহিনী থেকে ২০১৪ সালে অবসরে এসেছি। এরপর ভাইয়ের চাকরি সূত্রে সখীপুরের নলুয়া আড়ালিয়াপাড়া ভাড়া বাসা নিয়ে বসবাস শুরু করি। পরে তানভীনকে সখীপুরের বিএএফ শাহীন কলেজের ৭ম শ্রেণীতে ভর্তি করানো হয়। ছোটবেলা থেকেই তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেশি। অনেক রাত পর্যন্ত সে পড়াশোনা করতো। কখনও তাকে পড়ার জন্য বসতে বলতে হতো না। তানভীন ৫ম শ্রেণী, এসএসসি এবং এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছে। আজ ছেলে তার কাক্সিক্ষত ফল পেয়েছে। আমরা তার এই সফলতায় আনন্দিত।’

সখীপুর পাহাড়কাঞ্চনপুরের বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষক প্রণব কুমার বলেন, ‘তানভীন একজন মেধাবী ছাত্র। সে খুবই বিনয়ী। সে শিক্ষক ও সহপাঠীসহ সকলের কথা আগে ভালোভাবে শুনে তারপর উত্তর দেয়। কলেজ ও স্কুলে পড়াশোনায় সবার থেকে তানভীন ভালো করতো। সারাদেশের মধ্যে তানভীন মেডিক্যাল কলেজের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয়স্থান অধিকার করেছে। তার এ কাক্সিক্ষত ফলে আমরা শিক্ষকরা খুবই গর্বিত ও আনন্দিত।’ তানভীন ছাড়াও এ কলেজ থেকে রাকিব আহমেদ নামের আরও একজন ছাত্র বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে চান্স পেয়েছে বলেও তিনি জানান।

উল্লেখ্য, গত রবিবার (৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের এক ব্রিফিংয়ে এমবিবিএস ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১ লাখ ১৬ হাজার ৭৯২ জন। কৃতকার্য হয়েছেন ৪৮ হাজার ৯৭৫ জন। মেধা তালিকায় প্রথম হয়েছেন পাবনার মেয়ে মিশোরী মুনমুন। তিনি পাবনা মেডিক্যাল কলেজ কেন্দ্র থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তার মোট প্রাপ্ত নাম্বার ২৮৭.২৫।

(মজলুমের কণ্ঠ / ১০ এপ্রিল / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles