বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও বদলে যাওয়া বাঙ্গালী

।। মোঃ আবু হাসান তালুকদার ।।

 

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তদানিন্তনপূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে একটি শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছিল। তবে এ বিস্ফোরণে হিরোশিমা ও নাগাসাকির মত কোন ধ্বং সযজ্ঞ হয়নি, বিকরিত হয়নি কোন তেজস্ক্রিয়তা, ঘটেনি কোন প্রাণহানি। এ বিস্ফোরণেবিস্ফোরিতহয়েছিলভালবাসার। বিকরিতহয়েছিল দেশ প্রেম, আত্মত্যাগ, শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার বাসনা। এটি ছিল শব্দ বোমা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ নিঃসৃত ভাষণ।। সেদিন গল্পের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা যেন বাস্তবে নেমে এসেছিল।

হ্যামিলনের বাঁশির সুরের মতই বঙ্গবন্ধুর ভাষণে সৃষ্ট ভালবাসার ঢেউ ময়দানে উপস্থিত দশ লক্ষাধিক লোকের হৃদয় ছুঁয়েছ ড়িয়ে পড়েছিল শহর থেকে শহরান্তে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে। তৎকালীন রেসকোর্স (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৮মিনিটের দেয়া ভাষণে সমগ্র বাঙ্গালী জাতি ভালবাসার এক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল। জাগ্রত হয়েছিল দেশ প্রেম।

এ ভাষনের পর নেতার নির্দেশনা অনুযায়ী ঐক্যবদ্ধ জনগন অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেয় এবং মুকিÍসং গ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ঘোষনা অনুযায়ী দেশের স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত, কল-কারখানা সব বন্ধ হয়ে যায়। বিক্ষুব্দ জনতা পাকিস্থানি বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ করতে থাকে। খাজনা-ট্যাক্স আদায় বন্ধ হয়ে যায়। সেনানিবাস ব্যতীত সর্বত্র বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পরিচালিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে। বাঙ্গালীর হৃদয় জমিন যখন দেশ প্রেমে সিক্ত তখন ২৬শে মার্চ তিনি ডাক দিলেন স্বাধীনতার।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকেই বদলে গেল সবকিছু। যে কিশোর মাআদর করেনা খাওয়ালে খেতে চায়না সেই কিশোরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত পৌরুষ পুরুষ হয়ে বেরিয়ে এল। সবে কৈশর পেরনো যুবক পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে গেল। যে কৃষক রাজনীতি রসাত পাঁচ বুঝেনা সে হয়ে গেল দেশ সচেতন। শ্রমিক চাকুরী জীবিরকা জেমন বসেনা দেশের জন্য কিছু একটা করার বাসনায়। ছাত্রের কলম, কৃষকের কাস্তে, আর শ্রমিকের হাতুড়ীর পরিবর্তে হাতে উঠে এলরাইফেল, এস এল আর, গ্রেনেড। কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিকের লেখনী ধাবিত হলো এক মোহনার দিকে।লেখা তো নয় যেন আগ্নেয়াস্ত্র। শিল্পীর কণ্ঠে শুধুই দেশের সুর।

যে আমলা পাকিস্তানি বড় কর্তার ছায়ায় ঢাকা পড়েছিল তিনি হয়ে গেলেন ঝানু কুটনৈতিক। যে ছিল ছাত্র নেতা হয়ে গেলেন দক্ষ সংগঠক। দেশ প্রেমিক রাজনৈতিক নেতারা ঘাড়ে তুলে নিলেন বড়বড় দায়িত্ব। সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন বা মেজর বয়স কতইবা হবে দায়িত্ব নিলেন বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রের সেক্টর, সাব সেক্টরের কমান্ডিং এর। যে সৈনিক চাকুরী শেষে শান্তিতে অবসর জীবনযাপন করবেন ভেবেছিলেন তিনি দায়িত্ব নিলেন ছাত্র-শ্রমিক-জনতারসশ¯ত্র প্রশিক্ষনের দায়িত্ব। পাকবাহিনীর রক্তচক্ষু এড়িয়ে গোপনে চাকুরী ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দিলেন দলে দলে দেশ প্রেমিক সৈনিক।

যুদ্ধের শুরুতেই শুরু হল প্রতিরোধ যুদ্ধ। ২৫শে মার্চের কালোরাত্রিতে অপারেশন সার্চ লাইট নামে হানাদার পাক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানার ঘুমন্তনির¯ত্র বাঙালী পুলিশ আর ইপিআর সদস্যদের উপর। বাদ যায়নি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্র শিক্ষক কর্মচারী এবং সাধারণ নাগরিকও। এখানেই শেষ নয়। আসলে তারা পোড়ামাটি নীতি গ্রহন করেছিল। তাই সারাদেশে বাঙালী নিধনের অভিপ্রায়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসেসশ¯ত্রপাক সেনারা। এই সেনারা যাতে জনপদে ছড়িয়ে পড়তে না পারে তাই তো তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ। নির¯ত্র জনতা। কিন্তু তাতে কি ? রক্তে যে তাদের বান ডেকেছে। স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিতে হয় দিবে।বঙ্গবন্ধু তার ভাষনে বলেছিলেন, “ঘরেঘরে দুর্গ গড়ে তোল।”“তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক ”। বঙ্গবন্ধুর আহবান কি উপেক্ষা করা যায় ? তাইতো আপামরজনতা লাঠি সোটা, বল্লম, সরকি আর খালি হাতেই ঝাঁপিয়ে পড়লোসশ¯ত্র পাকিস্তানি সেনা কন ভয়ের উপরে। এভাবেই পাকবাহিনীর সাথে গাজীপুরের জয়দেবপুরে, চট্রগ্রামের মিরেরসরাই, টাংগাইলের সাটিয়ার চড়, বগুড়া,বরিশালসহ সারা দেশে প্রতিরোধযুদ্ধ সংঘটিত হয়। শহীদ হয় অনেক প্রতিরোধ যোদ্ধা। এক সময় বীর বাঙালীর প্রতিরোধব্যুহ ভেঙ্গে যায়।পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম প্রশিক্ষিত এক সেনাবাহিনীর সাথে কতক্ষন আর টিকে থাকা যায়। সারাদেশে চলতে থাকে হত্যা, অগ্নিসংযোগ ধর্ষণ, লুটতরাজ। কিন্তু বীর বাঙ্গালী চুপকরে থাকার পাত্র নয়। তারা প্রশিক্ষণ নেয়ার উদ্দেশ্যে দলে দলে চললো সীমান্ত পেরিয়ে ভরতে। ভারত সরকার তাদের সার্বিকসহযোগিতা করে।নিয়মিত সেনাবাহিনীর দুইবছরের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় মাত্র ২৮ দিনে। ফলে প্রশিক্ষণে তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করতে হয়। পাকিস্তনী সেনাবাহিনীর মত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। তাইতো তাদের গেরিলা যুদ্ধের কলা কৌশল শিখানো হয়।অবশেষে তারা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে আসে মতৃভূমির রণাঙ্গনে। শুরু হয় য়ুদ্ধ।অবশেষে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাঙ্গালী জাতি বিজয় অর্জন করে। ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন তার বিজয় অর্জিত হয় ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে। পৃথিবীর মানচিত্রে অংকিত হয় একটি স্বাধীনরাষ্ট্রের। নাম তার বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক, চাকুরীজীবি, বুদ্ধিজীবি, সাংস্কৃতিককর্মীসহ আপামর জনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙ্গালীর যুদ্ধ। এটি ছিল দেশ প্রেমের যুদ্ধ। এটি ছিল আবেগের যুদ্ধ। কেউ যুদ্ধ করেছে অস্ত্র নিয়ে, কেউ যুদ্ধ করেছে হাতের কাছে যা আছে তাই নিয়ে, কেউ যুদ্ধ করেছে সহযোগীতা দিয়ে, কেউবা যুদ্ধ করেছে আশ্রয় দিয়ে। গুটি কয়েক দেশ বিরোধী কুলাঙ্গার ব্যতীত সমগ্র জাতি ছিল মুক্তিকামী। পৃথিবীর কোন জাতির স্বাধীনতা ঘোষণা করে অর্জনের জন্য এত যুদ্ধ, এত রক্তক্ষয় করতে হয়নি। ত্রিশ লক্ষ শহীদের জীবন দান এবং দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জন করতে হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যেই রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ। এ ভাষণকে বুকে ধারণ করেই মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছে। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে দ্বিধা করেনি। এ ভাষনছিল বাঙ্গালির মুক্তির সনদ।এ ভাষন সারা দেশের মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। তাদের ঐক্যবদ্ধ করে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে দৃঢ় প্রতিঙ্গকরে। এ ভাষনে যেনযাদুর স্পর্শে বাঙালি জাতিকে বীরের জাতিতে রুপান্তরিত করেছে। এ ভাষনবিশে^র রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর এ ভাষনটিকেবিশ^ ঐতিহ্য World Heritage হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

লেখক: মোঃ আবু হাসান তালুকদার
উপ-মহাব্যবস্থাপক, অগ্রণী ব্যাংক

Related Articles