রৌমারীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের মুক্তাঞ্চল ঘোষনা ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষনের দাবি

।। এস,এম,এ মোমেন ।।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন উপজেলা রৌমারী। রৌমারীর অতীত ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে। কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী এক উজ্জল ঐতিহ্যের লালনস্থান। পাকিস্তান আমলে এবং ভারত বিভাগের সময় রৌমারী ছিল অত্যন্ত সরব। মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী বহুবার এসেছেন এখানে। প্রতিবার মুক্তিকামী মানুষকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে তিনি উজ্জীবিত করেছেন। পাকিস্তান কেল্লা কিংবা মানকাচর থানা দখলের জন্যে হাজার হাজার মানুষের লাঠি নিয়ে অগ্রসর হবার কথা আজ স্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যাযনি। এখানকার আন্দোলনের ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানীর সহযোগী ছিলেন মৌলভী চেরাগ আলী আলহাজ্ব কসব উদ্দিন এবং কমান্ডার গাজিবর রহমানসহ আরও অনেকে।১৯৪৮, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন ৬৯ এর গণআন্দোলন ৭১ এর স্বাধীকার আন্দোলনে রৌমারীর মুক্তিকামী মানুষ অংশ নিয়েছিল।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকেই রৌমারীর সংগ্রামী মানু্ষ রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭১সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমগ্র বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নে জর্জরিত,যুদ্ধ বিধ্বস্ত;  তখন এই রৌমারী-রাজিবপুর মুক্তাঞ্চল ছিল ১১নং সেক্টরের সাব হেড কোয়ার্টার। রক্ত ঝড়া  দিন গুলোতে রৌমারীই ছিল একমাত্র থানা, যেখানে বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী প্রবেশ করতে পারেনি। সেদিন রৌমারীর মুক্তিকামী মানুষ সম্মুখযুদ্ধে যেমন অংশগ্রহণ করেছেন, রক্ত ঝরিয়েছে, জীবন দিয়েছেন।তেমনি রৌমারীর পবিত্রমাটিতে প্রায় ৬৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা করছেন, তাঁদের খাদ্য-বস্ত্র-চিকিৎসা- সেবা, থাকার ব্যবস্হাসহ যাবতীয় রসদ যুগিয়েছেন।মেহেরপুরে মুজিবনগর  অস্হায়ী সরকার গঠিত হলেও সেই সরকারের যাবতীয় বেসাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্হা রৌমারীর পবিত্র মাটিতে চালু হয়েছিল।মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, চাঁনমারী, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ডাকব্যবস্হা,রাজস্হ অাদায়, টেলিফোন এন্ড টেলিগ্রাফ, প্রকাশনী,কাস্টমস্, মুদ্রাচালু , বিচার ব্যবস্থা,
করা হয়েছিল। প্রতি সাপ্তাহে অস্হায়ী সরকারকে প্রচুর অর্থ দেওয়া হত, মুুক্তাঞ্চলের সাপ্তাহিক মুখপত্র “অগ্রদূত”
পত্রিকা হাতে লিখে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপিয়ে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ও বিদেশে বিলি করা হত। এতে মুক্তিযোদ্ধাগণসহ পুরো জাতি উজ্জীবিত হয়ে উঠত। প্রখ্যাত
গেরিলা যোদ্ধা হারুন হাবীব সরকারের বিশেষ সংবাদদাতা হিসাবে রৌমারীতেই অবস্থান করেছিলেন।আমেরিকান এনবিসি টেলিভিশন এর একটি টিম রৌমারীতে আসে এবং প্রকৃত যুদ্ধের চিত্র ধারণ করেন।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুক্তাঞ্চল খ্যাত রৌমারী একটি গৌরব উজ্জ্বল নাম। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশের পদচারণা রৌমারী রণাঙ্গনে ছিল।

লেফটেন্যান্ট,কর্ণেল নুরনবী ২আগষ্ট থেকে রৌমারীতে সিভিল প্রশাসন চালুর উদ্যোগ নেন। ১০/১১ তারিখের মধ্যেই সেগুলো চালু করা হয়।এর পর আগষ্টের ২২তারিখ সেগুলো পরিদর্শনে আসেন মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী,তারপর আসেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। পরে মেজর জিয়াউর রহমান আসেন।

মুজিবনগর সরকারের সমস্ত কার্যক্রম এখানে পরিচালিত হতো। মুক্তাঞ্চল হিসেবে রৌমারী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় নাম। এখানকার প্রতিটি দুলিকণার সাথে জড়িয়ে রয়েছে দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র স্মৃতি। বাঙলাদেশের প্রায় ৬৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষন হয়েছে রৌমারীর পবিত্র মাটিতে। প্রশিক্ষণ কালের স্মৃতি রৌমারী সিজি জামান হাইস্কুল, ডাকবাংলো এবং চাদমারী কালের স্বাক্ষী হয়ে আজও স্বগর্ভে দাড়িয়ে আছে উত্তর পুরুষদের কাছে তার অতীত ঐতিহ্যের বার্তা নিয়ে। বুকে তার বড় ব্যাথা, বড় কষ্ট, বড় ক্ষোভ। এখানে মুক্তিযুদ্ধের অনেক বীর সেনানী এসেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জেনারেল ওসমানী, মেজর এম আবু তাহের, স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ খান ,মেজর জিয়াউর রহমান, কামরুজ্জামান হেনা,খন্দকার মোস্তাক,মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী,তারপর আসেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ আরও অনেকে।দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে ৭ জনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বী উত্তম,১৭৫ জনকে বীর বিক্রম,৪২৬ জনকে বীর প্রতীকে ভুষিত হয়েছেন।এদের মধ্য অন্যন্য বৈশিষ্ট্যে উজ্জল হয়ে আছেন সুবেদার আফতাব উদ্দিন বীর উত্তম-বীর প্রতীক,অন্যজন বীর প্রতীক তারামন বিবি।সরাসরি ১১নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষন পরিচালনা ও আক্রমণ রচনার প্রস্তুতি পর্ব রৌমারীর মুক্তাঞ্চলে নেয়া হয়েছিল। রৌমারীর মানুষ খাদ্য বস্ত্র আশ্রয় মনোবল দিয়ে এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে অগ্রগামী করেছেন। আজ আমরা তা ক্রমশ: ভুলে যাচ্ছি। রৌমারী মুক্তাঞ্চল থেকে ৭১ সালের ৩১ আগষ্ট রৌমারী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আজিজুল হক ও  মতিয়ার রহমানের সম্পাদনায় ‘অগ্রদূত’ নামের পত্রিকার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

যার মুদ্রন ও প্রকাশনার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ আলী ।ব্যবস্থাপনায় সাদাকাত হোসেন ছক্কু মিয়া এম এন এ, এবং নুরুল ইসলাম পাপ্পুমিয়া এমপিএ।যা নিয়মিত প্রকাশিত হতো।

মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ৫০ বছর পর যার প্রায় সব গুলো কপি একত্রিত করে উত্তরবঙ্গ যাদুঘরের ট্রাষ্টি এডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন এর সংগ্রহ ও সংকলনে,  গ্রন্থিক প্রকাশনী ঢাকা থেকে এলবাম আকারে বই প্রকাশ করেছে। আগামী কাল ৩১আগষ্ট ২০২১ মঙ্গলবার রৌমারীতে “অগ্রদূত” পত্রিকা প্রকাশের ৫০ বছর পুঁতি পালন করা হবে উত্তরবঙ্গ যাদুঘর এর উদ্যোগে।

এই রৌমারীর মাটিতে আজও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অনুপ্রেরণা যোগাতে মুক্তিযুদ্ধের কোন স্মৃতিস্তম্ভ, স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়নি। রৌমারীর আগামী প্রজন্ম কি মুক্তিযুদ্ধ রৌমারীর সাহসী ভুমিকাকে স্বগর্বে মনে রাখতে পারবে?

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজড়িত চাঁনমারী, রৌমারী সিজি জামান উচ্চ বিদ্যালয়,ডাকঘর,দাতব্য চিকিৎসালয়,টাকশাল, টাউন ক্লাব,শহীদমিনার সংলগ্ন কাঁচারীমাঠ,রৌমারী সিনিয়র আর্দশ ফাজিল মাদ্রাসা,টাপুরচর হাইস্কুলসহ সব স্মৃতি চিহৃ গুলো আজ হারিয়ে যেতে বসেছে।

কুড়িগ্রাম জেলার এমন কোনও গ্রাম নাই যেখানে শহীদদের রক্ত ঝরে নাই।রৌমারীর নয়জন সাহসী মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।রাজিবপুরে কোদালকাটির যুদ্ধে ৫৪জন মানুষ শহীদ হয়েছেন।কিন্ত কি পেলাম অামরা-?

স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বৎসরে বাংলাদেশ অনেকদুর এগিয়ে গেছে,কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে গৌরবউজ্জল ভুমিকা রাখা সেই ঐতিহাসিক রৌমারী, রাজিবপুরে অার্থসামাজিক উন্নয়নের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

তাই রৌমারীর সংগ্রামী ভুমিকাকে দেশব্যাপী পরিচিত করে তুলে ধরা একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তাঞ্চলের স্বীকৃতি চাই।

সচেতন মহলের দাবি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য গুলো সংরক্ষন-রক্ষা করে মুক্তাঞ্চল খ্যাত রৌমারীতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ, মুক্তিযুদ্ধের যাদুঘর, “অপরাজেয় রৌমারী” নামে একটা টাওয়ার করা দরকার যা থেকে পুরো মুুক্তাঞ্চল, ব্রহ্মপুত্র নদ,  আম মেঘালয় পাহাড়,মীরজুমলার মাজার,সুখচর, ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস মুখ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

রৌমারী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার,চানঁমারী সংলগ্ন পুকুরপাড়,রৌমারী মডেল সরকারী প্রাথমিক ও সিজিজামান হাই স্কুলসহ কাচারী মাঠ হয়ে শহীদ স্মৃতিক্লাব ,থানা পর্যন্ত এলাকা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিজড়িত স্হাপনা গড়ে তোলা যায়। রৌমারীর ৯ জন কীর্তিসন্তান শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ৯ টি , ১জন ভাষা সৈনিক (রস্তম আলী দেওয়ান),তৎকালিন এম,এল এ নুরুল ইসলাম (পাপুমিয়া),মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অাজিজুল হক,ফজলুল হক খান (তৎকালিন থানা আ.’লীগ সা:সম্পাদক)লেফটেন্যান্ট কর্ণেল( অব:) এস,আ,এম নুরনবী খান( বীর বিক্রম)সুবেদার আলতাফ বীর উত্তম-বীরবিক্রম, তারামন বিবি (বীরপ্রতীক) এস,কে মজিদ মুকুল (বীরমুক্তিযোদ্ধা)সহ কীর্তিমানদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য রাস্তার নামকরণ, মোড়ের নামকরণ,মিলনায়তনের (হলরুম) নামকরন, পাঠাগারের নামকরণ, তোরণের(গেট) নামকরন করা যেতে পারে।তা না হলে অাগামী প্রজন্ম নিকট মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চলখ্যাত রৌমারীর গৌরবউজ্জল ইতিহাস অধরাই থেকে যাবে।একাত্তরের মুক্তাঞ্চল খ্যাত রৌমারীবাসীর দাবি গুলো বাস্তবায়নে  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়,রৌমারীর কীর্তিসন্তান মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, সংস্কৃতি মন্ত্রী,সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষসহ সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ,উপজেলা প্রশাসন,উপজেলা পরিষদসহ সংশিষ্ট সকলের দৃষ্টিঅাকর্ষন করছি।

একাত্তরে রক্তঝড়া দিন গুলোতে গৌরবউজ্জল ভুমিকা পালন করা রৌমারীকে রাষ্ট্রীয় ভাবে মুক্তিযুদ্ধের মুুক্তাঞ্চলের স্বীকৃতি দেওয়া ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহৃ সংরক্ষনের দাবি আজ মুক্তাঞ্চল খ্যাত রৌমারীবাসীর প্রাণের দাবি।

তথ্য সুত্রঃ(মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বিভিন্ন বই প্রস্তক থেকে সংগ্রহ।)

এস,এম,এ মোমেন
সাংবাদিক ও সাবেক
সাংগঠনিক সম্পাদক
রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি,কুড়িগ্রামজেলা
drmomen65@gmail.com

Related Articles