করোনার সময়ে টাঙ্গাইলের খেলাধূলা

মোজাম্মেল হক:

“লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা” বাংলায় যার অর্থ কলেরার সময়ের ভালোবাসা। স্প্যানিশ লেখক গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের‘ এল আমোর এন লোস তিম্পোস দেল কোলেরা’ গ্রন্থে বলেছেন সেই কলেরাকালীন সময়ে। শতবর্ষ আগের সময়টায় ওই রোগের প্রাদুর্ভাব প্রবলভাবে ছিল পৃথিবীতে। এখন যেমন করোনা ভাইরাস “কোভিড ১৯” মহামারী করোনার কারনে বদলে গেছে পুরো বিশ্ব। ক্রীড়াবিশ্বও এর বাইরে থাকে কী করে! ‘ স্পোর্টস ইন দ্য টাইম অব করোনা!-র সঙ্গে আগের সময়ের তো মিল নেই কোনো“ বিশুদ্ধ বিনোদনের এই জায়গায় মানুষের ভালোবাসা অফুরান। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি বর্তমান বাস্তবা মেনে সেই ‘মানুষ’ই যেন হয়ে পড়ছে ব্রাত্য।

কিভাবে ? দর্শকবিহীন স্টেডিয়ামে খেলা চালু করা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অবশ্যই সেটি মহামারী করোনাকালীন সময়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করেই।
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাস অদ্ভুত আঁধার নিয়ে এসেছে গোটা পৃথিবীতে। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নেমে এলো সেই অন্ধকারের ছায়া। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে দর্শকবিহীন ফুটবল এবং ক্রিকেট খেলা ফেরানো হলো। কিন্তু জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে খেলা করোনা কালে ফেরানো গেলো না। যেখান থেকে খেলোয়াড় নিজেকে তৈরী করতে পারবে, যেখানে থেকে গড়ে উঠবে ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলার। বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেট, সেটি কিন্তু জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে মাঠে ফেরানো যাচ্ছে না কিছুতেই। সারা দেশের মতো টাঙ্গাইলের ক্রীড়াঙ্গন ও থেমে আছে । করোনা কালের মাঝে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা বয়স ভিত্তিক ফুটবল ক্রিকেট আয়োজন করে দায়সারা ভাবে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগ যথেষ্ট আলো ছড়িয়েছিলো। কিন্তু মহামারী করোনার প্রাদুভার্ব আবারো বেড়ে যাওয়ায় সরকারের লকডাউন ঘোষনায় আকর্ষনীয় পর্ব সেমিফাইনাল ও ফাইনালের আগেই লীগ স্থগিত। জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুন্ম-সাধারণ সম্পাদক ও ক্রিকেট উপ-কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাতিনুজ্জামান সুখন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সামনে অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে লীগের বাকী অংশ শেষ করবেন। অপেক্ষায় আছেন টাঙ্গাইলের আগ্রহী ক্রিকেটারগন। এখন লকডাউন না থাকার কারনে প্রতিদিনই উঠতি ক্রিকেটারগন স্বাস্থ্যবিধি(মাস্ক পড়ে) আউটার স্টেডিয়ামে ক্রিকেট প্র্যাকটিস শুরু করছেন। টাঙ্গাইল জেলার ক্রিকেট কোচ আরাফাত রহমানের স্পোর্টস একাডেমী এবং সাবেক কৃতী ক্রিকেটার ইসলাম খান ও রিপন কুমার এর ক্রিকেট শেখার আসরে প্রতিদিন নতুন ছাত্র বাড়তে শুরু করছে। অথচ করোনার পূর্বে টাঙ্গাইল স্পোর্টস একাডেমী ও টাঙ্গাইল টাইগার্স ক্রিকেট একাডেমীতে শিক্ষনীয় ক্রিকেটার ছিল প্রায় ছয়শ। ক্রিকেট কোচ আরাফাত রহমান ও ইসলাম খান সাথে কথা বলে জানা গেছে করোনার কারনে টাঙ্গাইলের ক্রিকেটের চরম ক্ষতি হয়ে গেছে। একসময় দ্ইু ক্রিকেট ক্যাম্পে ছয়শ মতো শিক্ষনীয় ক্রিকেটার ছিল বর্তমানে একশ জনের মতো। কম হওয়ার কারন করোনার কারনে অনেক অভিভাবকের আর্থিক অবস্থা পড়ে যাওয়া। করোনার কারনে শহরে অভিভাবকের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার কারনে গ্রামে চলে যাওয়া। এছাড়া এখনও অভিভাবক গণের মাঝে করোনার ভীতি কাজ করছে। তারপর তারা আশাবাদী আগের পরিবেশে টাঙ্গাইলে ক্রিকেট অচিরেই প্রবেশ করবে।

সারা বিশ্বে মান যাই থাকুক, ফুটবল খেলায় দর্শক বেশী হবেই। টাঙ্গাইলে ফুটবলেও একই অবস্থা। জনপ্রিয় ক্রিকেট খেলায় মাঠে দর্শক না থাকলেও ফুটবল খেলায় দর্শক এখন প্রচুর হয়। তার প্রমাণ করোনা কালেই বয়সভিত্তিক ফুটবল খেলা। অচিরেই টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামে ফুটবলের মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ফুটবল টুর্নামেন্টের পাশাপাশি খেলোয়াড়গন স্বাস্থ্যবিধি ঠিক রেখে ফুটবল খেলে যাচ্ছে। টাঙ্গাইল স্টেডিয়ামের পাশে আতিকুর রহমান জামিলের ফুটবল ক্যাম্পে নতুন ফুটবলারসহ বাড়ী চলে যাওয়া ফুটবলারগন ক্যাম্পে ফিরে আসছে। তাদের লক্ষ্য ফুটবল খেলা শিখে ভালো মানের ফুটবলার হওয়া। আর ভালো মানের ফুটবলার হলে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হওয়া যাবে। কারণ টাঙ্গাইল এখন ফুটবল জোয়ারে ভাসছে। বাংলাদেশ জাতীয় দলে টাঙ্গাইলের ৬ জন ফুটবলার অংশগ্রহন করছে। তারা হলো সন্তোষের রায়হান, বিষ্ণনাথ, গোপালপুরের রবিউল, হুগড়ার সুমন রেজা, সখিপুরের রাসেল মাহমুদ লিটন এবং সদ্য বাংলাদেশ জাতীয় দলে ডাক পাওয়া ফ্রান্স প্রবাসী মির্জাপরে জন্মগ্রহনকারী মধ্যমাঠের ফুটবলার তাহমিদ । এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলছে অনিক, শীতলসহ ১৬ জন। একসময় নারায়নগঞ্জের ফুটবলারগন জাতীয় দলে বেশী ছিল, সেই সুনাম এখন টাঙ্গাইল জেলার ফুটবলারদের দখলে।

টাঙ্গাইলে কোভিড১৯ পরিস্থিতি সামলে ফেরার চেষ্টায় অন্যান্য খেলাও আছে। জানা গেছে টাঙ্গাইল চেস ক্লাব ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাব ভিত্তিক দাবা টুর্নামেন্টের আয়োজনের চেষ্টায় আছে। এই দাবা টুর্নামেন্টে জেলার দুইজন এবং জেলার বাইরের দুইজন নিয়ে ক্লাবগুলো অংশগ্রহন করবে। ফুটবল ক্রিকেট দাবার পর বিভিন্ন খেলার খেলোয়াড়গন ধীরে ধীরে মাঠে ফিরে আসবে। অবশ্যই আসবে,
সেটা কত সময় ? কলেরার সময়ের ভালোবাসা নিয়ে র্মাকেজের যে উপন্যাস, এর ঘটনার ব্যাপ্তিকাল ৫০ বছরের বেশ। এবার করোনার ধাক্কা পৃথিবীকে নিশ্চয়ই এত দিন সইতে হবে না! বরং ভালোবাসার ক্রীড়াঙ্গন সারা বাংলাদেশের মতো টাঙ্গাইল জেলায় অচিরেই ফিরবে গমগমে স্বরুপে- এমন প্রত্যাশাই দর্শক-সমর্থকদের।

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ৮সেপ্টেম্বর/ আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles