বিবস্ত্র সাংবাদিকতা!

।।রেজাউল করিম।।

ক’বছর আগেও সাংবাদিকতা ছিল একটি মহান পেশা। সেবা ছিল এই পেশার ব্রত। সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভও বলা হয়। সাংবাদিকতা এমন একটি মাধ্যম যার বদৌলতে একটি রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত রাখা সম্ভব। প্রক্ষান্তরে সাংবাদিকতা লাইনচ্যুত হলে একটি রাষ্ট্র দুর্নীতির চাদরে ঢেকে যেতে পারে। দুর্নীতি যখন একটি রাষ্ট্রের অহরহ ঘটনা , সাংবাদিকতা ওই মুহুর্তে প্রশ্নবিদ্ধ। একসময় সাংবাদিকরা ছিলেন চিন্তাবিদ। কেননা চিন্তাবিদরাই আসতেন সাংবাদিকতায়। তখন মঞ্চে সাংবাদিকরা মূল্যায়িত হতো। সাংবাদিকতা যখন সহজলভ্য হল, সাংবাদিকতার মান তখন বিনষ্ট হলো। গণমাধ্যম যখন বাড়তে শুরু হল, সাংবাদিকতা তখন সহজ হতে লাগলো। আর কমতে লাগলো সাংবাদিকতার কদর। সাংবাদিকতার গুরুত্বে সাথে সামাজিক মর্যাদাও কমতে লাগলো। সাংবাদিকতা এখন বিবস্ত্র হয়ে পড়েছে। যার পরিবর্তন জরুরী।

কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার তদন্ত করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অনুসন্ধান করবে সাংবাদিক। কিন্তু সময়ের সাথে চলতে গিয়ে সাংবাদিকতা অনেকটা প্রেস ব্রিফিং কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যেভাবে বক্তব্য দেবেন প্রতিবেদন সেই মোতাবেক হবে। অনুসন্ধানের সাহসিকতা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। সম্প্রতি দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়ার একটি বৃদ্ধাশ্রম থেকে গৃহবধুর লাশ উদ্ধার হল। স্ত্রী হত্যার অভিযোগ উঠল স্বামীর বিরুদ্ধে। তিনদিন পর নিহত স্ত্রীর স্বামীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হল তার গ্রামের বাড়ি এলাসিন থেকে। পত্রিকায় ছাপা হল স্ত্রী হত্যার তিনদিন পর স্বামীর আত্মহত্যা। আদৌ স্ত্রীকে হত্যা করেছিল কিনা অথবা স্বামী আত্মহত্যা করলো কিনা এটা গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন ছিল। অনুসন্ধান কিন্তু হয়নি। অনুসন্ধানে এমন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারতো, আক্রোশে প্রথমে গ্রহবধুকে হত্যা , সুযোগ বুঝে নিহতের স্বামীকে হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে চতুর কোন তৃতীয় পক্ষ। বন্যায় পানি হবে, এটা স্বাভাবিক, ঈদের আগে মহাসড়কে যানজট হবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু গণমাধ্যম এটাকে অস্বাভাবিক করে ফেলি। একজন আত্মহত্যা করবে বা গাড়ি চাপায় মারা যাবে এটা আগেও হতো। এক্ষেত্রে ঘটনার প্রতিবেদনটা যতোটা জরুরী, তার চেয়ে জরুরী কারণটা উদঘাটন করতে নন্যুতম অনুসন্ধান করা। বারবার ফলোআপ করা। ফলোআপ প্রতিবেদন চোখেই পড়ে না। কিন্তু একটি প্রতিবেদনে প্রাথমিক তথ্য থাকতে পারে। ফলোআপে থাকার কথা সর্বশেষ তথ্য। ফলাফল। প্রতিক্রিয়া। অথচ ফলোআপই হচ্ছে না।

কিছুদিন আগে চট্রগামে নিখোঁজের চারদিন পর সীতাকুন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া সাংবাদিক গোলাম সরওয়ারের মুখের ভাষা ছিল ‘প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমি আর নিউজ করবো না’। বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে রাতের আধারে ধরে নিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে এক বছরের জেল দেওয়া, এটিএন বাংলার সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুণিকে ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হত্যার ৯ বছর পার হলেও বিচার না হওয়া সাংবাদিকদের অবস্থার প্রতিচ্ছবি । সাংবাদিকদের এমন পরিণতির উদাহরণ চারপশে অসংখ্য।সাংবাদিকতাকে শেখড় থেকে শিকড়ে নামিছে কিছু গণমাধ্যম নামক কিছু হাউজ আর তাদের নিয়োগ প্রাপ্ত একঝাঁক অযোগ্য সাংবাদিক। মাঠ পর্যায়ের সংবাদকর্মী দিয়ে সমস্যাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করি। এখন সাংবাদিকদের বড় একটি অংশের সাংবাদিকতা সম্পর্কে তেমন কোন ধারনা নেই। কারও হাত ধরে উঠে এসেছে সাংবাদিকতায়। এদের প্রশ্ন করলে অনেক ভেবে উত্তর দিতে হবে শেষবারের মতো কতোদিন আগে দুলাইন লিখেছিল। কেউ কেউ পেনড্রাইভ ছেড়ে এখন সিসির অপেক্ষায় থাকেন। নিয়োগের আগে লেখার অভিজ্ঞতা দেখাতে হয়নি। নিয়োগের পর সিসির ভিড়ে নিজেকে লিখতে হয়নি। বর্তমানে একটি পরিস্কার পোশাক, একটি লম্ভা ক্যামেরা নিয়ে স্থানীয় একজন সাংবাদিকের সাথে চলাটাই সাংবাদিকতার প্রথম ধাম। অতঃপর বিশাল মিডিয়ার প্রতিনিধি এবং বড় একজন সাংবাদিক।

কিছু সাংবাদিক আছেন, সকাল বেলা বের হয়ে শুরু করেন অফিস ভিজিট। প্রায়ই শোনা যায়, এটা দেন নইলে নিউজ হবে। বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী টাকা দেন। অতঃপর নিউজ বন্ধ। কেউ কেউ নিউজ হলে ভুক্তভোগীকে গিয়ে বলেন ওটা দেন নইলে আরও পত্রিকায়ও নিউজ হবে। ভুক্তভোগী সুবিধা দেন। সুবিধা পেয়ে বলেন, ওই সাংবাদিককে আমি দেখবো। কিছু সাংবাদিক আছেন, যারা রাষ্ট্রীয় আমলাদের প্রশ্রয়দাতা বা সহযোগি হয়েও কাজ করেন। কিছু সাংবাদিক আছেন যারা ভাড়ায় চালিত। একটি মাস্ক বিতরণের নিউজ করা দাদের দায়বদ্ধতা। কিছু সাংবাদিক আছেন, সাংবাদিক বিষয়টিকে তারা সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে তার নিজস্ব ব্যবসা বানিজ্যে অতিরিক্ত ফায়দা নেন। পকেটে চার-পাঁচটা পত্রিকার কার্ড নিয়ে চলেন এমন সাংবাদিকও কম নেই। অনেকে আবার রাজনৈতিক হামলা মামলা থেকেও বাঁচতে এখন সাংবাদিকতার আশ্রয় নেন। কিছু সাংবাদিক দলীয় বিটের মতো কাজ করেন। কিছু সাংবাদিক আছেন যারা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। ঘটনা ঘটার সাথে সাথে এই চক্রটি ঘটনাস্থলে হাজির। কিছু সাংবাদিক আছেন যাদেরকে কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা নিয়ে ব্যস্ত। নিজেরা দুকলম লেখার সামর্থ্য না থাকলেও ধার করা লেখা প্রকাশ করে পরদিন পত্রিকা নিয়ে অফিসে অফিসে হাজির।

তবে সংখ্যায় কম হলেও কিছু সাংবাদিক এখনো সাংবাদিকতার আদর্শ ধরে রেখেছেন। এদের নীতি-আদর্শের বলেই সাংবাদিকতা নামটা অন্তত রয়ে গেছে । এরা তথ্য সংগ্রহ করতেও বিড়ম্বিত হয়। সরকারি-বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পাননা। এদের রাজনৈতিক অন্ধত্ব নেই। এরা নেপথ্যে সারাদিন রাত তথ্য উপাত্ত্ব নিয়ে কাজ করেন। প্রতিদান নয় দায়িত্ববোধ থেকেই এদের কাজে লেগে থাকা।

একবার সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) উপনির্বাচনে ১৭৬টি ভোট বাতিল হয়েছিল। যারা ঠিকমত টিক চিহ্নটিও দিতে পারেনি। তারা কলম চালাবে কীভাবে? অবস্থা দেখে তখন অনেকে বলেছিলেন, এরাই অপসাংবাদিক। এরাই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সাংবাদিকতার মাঠ। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এরা বানিয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের বিশেষ কেন্দ্র।

আসা যাক নিয়োগ থেকে। অধিকাংশ হাউজে প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া হয় সুপারিশের ভিত্তিতে। সাক্ষাতকার নেওয়া বা মেধা যাচাই জরুরি না। থাকতে হয় মজবুত লোবিং। বর্তমানে কিছু ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়া নগদ ডোনেশনের মাধ্যমে একই জেলাতে একাধিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। অধিকাংশ গণমাধ্যম হাউজ প্রতিনিধিদের কোন প্রকার বেতন ভাতা দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন না। একটি আইডি কার্ড দিয়ে বুঝিয়ে দেন লোগোই শক্তি। লোগোই বল। এই শক্তির মাধ্যমে বাড়াতে হবে উপার্জন ও ভক্তি। বেতন ভাতা না পেয়ে অনিচ্ছা স্বত্বেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন কোন কোন সাংবাদিক। ক’জন আর সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ালেখা করে সাংবাদিকতায় আসে। মফস্বল পর্যায়ে নেই বলেই চলে। বেতন ভাতা না দেওয়ায় মেধাবিরা সাংবাদিকতায় আসছে না। এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে একটি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় কিছুদিন ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব পালনের পর নিয়োগ পায় সাংবাদিকতায়। পত্রিকা অফিসের পিয়ন কিছুদিন পর নিয়োগ পায় সাংবাদিকতায়। ইংরেজি ভার্সনের দৈনিকে কিছু প্রতিনিধি নিয়োগ পায়, যারা ছবি ছাড়া নিজের নিউজটাও পত্রিকাতে খুজে পেতে কষ্ট হয়। অনলাইন নিউজপোর্টাল বেড়ে যাওয়ায় সাংবাদিকতা হলো আরও সহজলভ্য। অনলাইনে দ্রুত সংবাদ পাঠাতে গিয়ে অনেক সময় অসম্পন্ন সংবাদ পাঠাতে বাধ্য হয় প্রতিনিধিরা। একজন সংবাদকর্মী একডর্জন পোর্টালের রিপোর্টার। সাংবাদিক আর বিজ্ঞাপনদাতা মিলে একাকার। লেখা না পাঠালে হাউজ লেখা সংগ্রহ করতে পারে। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে সাংবাদিকতা হয় হাতছাড়া। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠায়ও রয়েছে গোড়ায় গলদ। না হয় গ্রুপ বাঁচাতে অন্যথায় ব্যক্তি স্বার্থে কিছু মিডিয়ার জন্ম।

সাংবাদিক কখনো নিরপেক্ষ হয় না। হওয়া উচিতও নয়। সাংবাদিকের অবশ্যই রাজনৈতিক মতাদর্শ আছে। এদেশে অনেক বড় বড় তারকা সাংবাদিক ছিলেন যারা রাজনীতি ও সাংবাদিকতা সমান্তরালভাবে করেছেন। হ্যাঁ, তার মানে এই নয় সাংবাদিক তার নিজের পছন্দের দলের সমালোচনা করবেন না বা গোপন করে যাবেন। রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয় বা উদাসীন এমন সাংবাদিক কখনোই সাহসী সাংবাদিক হতে পারেন না। আবার যিনি নিজ দলের ভুল না ধরে সারাক্ষণ দলের প্রশংসা করেন তাদের সাংবাদিকতায় না আসাটাই ভাল। সাংবাদিকতা মানে কারো প্রেসরিলিজ নিয়ে দৌড়ানো নয়। এটা বিশাল জগৎ। একজন সাংবাদিক একজন গবেষক। সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা দিক নিয়ে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি যেমন তার থাকা উচিৎ তেমনি নিজ নিজ জায়গা থেকে কথা বলার সৎসাহস তার থাকবে এটাও সবাই প্রত্যাশা করে। একজন লেখক বা সাংবাদিকের কোন বন্ধু নেই। যে সাংবাদিক খুব জনপ্রি, সবাই বাহবা দেয় বুঝতে হবে তিনি সাংবাদিক হয়ে উঠতে পারেন নি। আবার যে সাংবাদিকের কোন আপনজন নেই, সবাই যার উপর বিরক্ত- তিনিও ভুল পথে হাঁটছেন। শত্রু মিত্র থাকবেই। তবে এ পেশায় বন্ধুত্ব হবে পেশার কল্যাণে।

গত ২৯ অক্টোবর ফেনীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হলুদ সাংবাদিকতা রুখতে সারাদেশের সাংবাদিকদের ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। শেষে সবাইকে সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। প্রেস কাউন্সিলের পরিচয়পত্রের বাইরে সাংবাদিকতা করার সুযোগ থাকবে না। এতে নিশ্চিত হওয়া যায় সাংবাদিকদের মানোন্নয়ন সম্পর্কে প্রেস কাউন্সিলেরও স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। তবে এই তালিকাটা যদি বিশেষ কোন গোষ্ঠির হাতে চলে যায় তাতেও সাংবাদিকতা বিবস্ত্রই থেকে যাবে। এ পরিস্থিতি থেকে ফিরে আসতে জোরালো প্রদক্ষেপ জরুরী।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

(মজলুমের কণ্ঠ / ১ সেপ্টেম্বর/ আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles