স্বচ্ছ নিয়োগে প্রশংসিত পুলিশ বিভাগ

মো. আবু কাওছার আহমেদ:

২০১৮ সালে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার বাংলা বাজার মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাশ করেন তানিয়া খাতুন। তিনি উপজেলার নারচী গ্রামের শফিকুল ইসলামের মেয়ে। তাদের মা, দুই বোন ও এক ভাইয়ের সংসার চালাতে কষ্ট হতো কৃষক বাবার। আত্মীয় স্বজনের সহযোগিতায় দাখিল পাশ করেছেন তিনি। তারপর নিজে টিউশনি করে দরিদ্র বাবাকে সহযোগিতা করতেন। তার একটি চাকুরীর খুব প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু অনেক খুঁজে একটি চাকুরী পাননি।  ছোট বেলা থেকে স্বপ্ন দেখতেন পুলিশ হবেন। কিন্তু অন্যের কাছে শুনেছেন পুলিশে চাকুরী নিতে অনেক টাকা লাগে। সামর্থ না থাকায় তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হয়। তারপরও নিজ ইচ্ছে শক্তি থেকে ১০০ টাকা ব্যাংক চালান ও অনলাইন খরচ ৩০ টাকা দিয়ে আবেদন করেন। অবশেষে শুক্রবার (২৬ নভেম্বর) দিবাগত রাত একটায় ফলাফলে তিনি চাকুরী পান। জেলা পুলিশ লাইনস মাঠের গ্রিল শেডে ফলাফল ঘোষণা করেন পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার। এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) কাজী নুজহাত এদীব লুনা, গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম, মুন্সিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজ উদ্দিন প্রমুখ।

একশ টাকার ব্যাংক চালানে শুধু তানিয়া নয়, তার মতো টাঙ্গাইলের আরো ১০ নারীসহ ৬৪ জনের চাকুরী হয়েছে।

তানিয়া খাতুন বলেন, স্বপ্ন ছিলো পুলিশ হবো। চাকুরী নিতে অনেক টাকা লাগে তাই ভয় পেতাম। ১০০ টাকায় পুলিশের চাকুরী হবে কল্পনাও করিনি। চাকুরী পাওয়ায় আল্লাহ তালার কাছে শুকরিয়া জানাই। বাংলাদেশ পুলিশের কাছে কৃতজ্ঞ কাউকে কোন ঘুষ দিতে হয়নি।

জেলা পুলিশ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ পরীক্ষায় অংশ নিতে সর্বমোট ৩ হাজার নারী-পুরুষ আবেদন করে। প্রথম দিন উচ্চতা ও প্রার্থীদের সনদ যাচাই করে ২২৪৭ থেকে ১১৪৮ জনকে শারিরীক সক্ষমতার জন্য উত্তীর্ণ করা হয়েছিলো। এদের মধ্যে ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে ৭৬৩ জন উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে ৪৯৭ জনকে লিখিত পরীক্ষার জন্য রাখা হয়। এদের মধ্যে ১৬৫ জন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর পুলিশের ‘ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে’ শারিরীকভাবে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। ১৯ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষা হয়। ২৬ নভেম্বর দিনব্যাপি ১৬৫ জনের ভাইবা ও মনোতাত্বিক পরীক্ষায় চুরান্তভাবে ৭৫ জনকে নির্বাচন করা হয়। টাঙ্গাইলে একশ টাকা ব্যাংক ড্রাফটে পুলিশে (ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পদে) চাকুরী পেয়েছেন তারা। বিনা ঘুসে চাকরি পেয়ে তাদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এসব চূড়ান্ত প্রার্থীর অভিভাবকরা কখনো বিশ্বাসই করতে পারেননি তাদের সন্তানদে ঘুষ ছাড়া পুলিশে চাকুরী হবে। স্বচ্ছতা ও সততার এ বিরল দৃষ্টান্ত  স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার।

পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সিরাজুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার আগে অনেকেই বলেছেন দালাল ছাড়া পুলিশে চাকুরী হবে না। তাদের ধারণা ভুল। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা হবে। ঠিক তাই হয়েছে, মাঠে না আসলে বুঝতাম না বর্তমান সময়ে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকুরী হয়।

সাকিব আল হাসান শ্রাবন বলেন, আমার বাবা কৃষি কাজ করায় আয় রোজগার কম। তারপরও ইচ্ছে ছিলো পড়াশোনা করবো, মানুষের মতো মানুষ হয়ে পিতা মাতা দেশ ও জনগনের সেবা করবো। সেটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রচুর কষ্ট করেছি জীবনে। কষ্টের কারণেই আল্লাহ পাক মুখ তুলে তাকিয়েছেন। এতে পুলিশের আইজীপি ও টাঙ্গাইলের এসপিকে ধন্যবাদ জানাই। দেশের জন্য কাজ করতে চাই। সকলের দোয়া ও সহযোগিতা চাই।

তাসলিমা রশিদ জানান, ব্যাংক চালান ১০০, ভ্যাট, অনলাইন ও এসএমএস চার্জ দিয়ে আরো ৩০ টাকা লেগেছে। সবই মিলে ১৩০ টাকা খরচ করে পুলিশের চাকুরী পেয়েছেন।

লিটন নামের এক অভিভাবক বলেন, আমি পেশায় ডোম। আমি কখনও চাইনি আমার ছেলেও এই পেশায় আসুক। বিনা টাকায় পুলিশে চাকুরী হওয়া আমি খুবই আনন্দিত।

পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, বিগত বছরে যে ধারাবাহিকতা ছিলো, প্রধানমন্ত্রী, সস্বরাাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজীপি সারের নির্দেশে সেই ধারাবাহিকতার পরিবর্তন এনেছি। নতুন পদ্ধতিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কাউকে চালান ফি ছাড়া অন্য কোন ফি দিয়ে চাকুরী নিতে হয়নি। মেধা ও যোগ্যতায় চাকুরী হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।

(মজলুমের কণ্ঠ / ২৭ নভেম্বর / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles