দুইশ কল গেল ৯৯৯-এ

অলাইন ডেস্ক:

কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে প্রতিবছর নানা আয়োজনে থার্টিফার্স্ট নাইট বা খ্রিষ্টীয় নববর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক ভবনের ছাদেও চলে উৎসব। ফানুস আর আতশবাজির আলোয় ঝলমলে হয়ে ওঠে আকাশ। তবে উদযাপনে সতর্ক ও দায়িত্বশীল না হওয়ার কারণে অগ্নিদুর্ঘটনাসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। আবার শেষ রাত পর্যন্ত আতশবাজির  কারণে মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন।

অনেকে বলছেন, উৎসব বাধাগ্রস্ত করা ঠিক নয়। আনন্দ-উদযাপন হোক, তবে তা যেন দুর্ঘটনার কারণ না হয়ে ওঠে। একজনের আনন্দ যেন অন্যের ক্ষতি না করে।

শুক্রবার মধ্যরাতে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে সারাদেশ থেকে প্রায় ২০০টি অগ্নিকাে র খবর আসে ফায়ার সার্ভিস ও জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর কন্ট্রোল রুমে। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক তথ্য বলছে, অগ্নিকাে র বেশিরভাগ ঘটেছে ফানুসের কারণে। তবে কয়েকটি আগুন আতশবাজির কারণেও লেগেছে। ঢাকায় অন্তত ১০টি স্থানে আগুন লাগার কথা শোনা গেছে। এর মধ্যে সাতটি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসকে কল করা হয়। মিরপুর, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, ডেমরা, সূত্রাপুর, লালবাগ ও কেরানীগঞ্জে ওইসব ঘটনা ঘটে। তবে নববর্ষ ঘিরে ফানুস বা আতশবাজি থেকে দেশের কোনো অগ্নিকাণ্ড বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ  বলেন, খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উদযাপন এখন আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে গেছে। আমরাও এই দিনপঞ্জি ব্যবহার করছি। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ সময় গড্ডল প্রবাহে গা ভাসাই। কী কারণে উদযাপন, তা নিজেদের কাছেও স্পষ্ট নয়। উৎসব হবে সবার অংশগ্রহণে; সবাই উপভোগ করবে। আমার আনন্দ-উচ্ছ্বাস যেন আরেকজনের দুর্ভোগের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা কতটুকু উদযাপন করব, সেটাও বুঝতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম  বলেন, টিনএজদের মধ্যে নববর্ষ ঘিরে ফানুস উড়িয়ে ও আতশবাজি ফুটিয়ে আনন্দ করতে দেখা যায়। নগরবাসীকে অনুরোধ করেছিলাম যাতে কারও আনন্দ অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়। অনেক ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় হয়েছে। ঢাকা শহরের লাখ লাখ বাসার ছাদে গিয়ে তো পুলিশের পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়। নববর্ষ ঘিরে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়ও আনন্দ হয়। তবে তারা অন্য মানুষের ভোগান্তি ও সমস্যার বিষয় মাথায় রাখে। আগামীতে এ ধরনের উপলক্ষের আগে আমরা আরও সতর্ক থাকব, যাতে আগুন-সহায়ক সরঞ্জাম হাত বাড়ালেই না পাওয়া যায়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিপ্রা সরকার  বলেন, তরুণরা এ ধরনের উদযাপন বেশি করে এবং বেশিরভাগ সময় তারা অন্যের সমস্যার বিষয়টি ভাবে না। আসলে আমরা ছোটবেলা থেকে তাদের সেভাবে চিন্তা করতে শেখাইনি; সেভাবে বড় করে তুলতে পারিনি। সামাজিক রীতি-নীতি মানলেও বয়স্ক, অসুস্থ বা শিশুদের প্রতি আলাদা নজর দেওয়ার কথা। আর শুধু তো তরুণরা নয়; এর সঙ্গে পূর্ণবয়স্ক অনেকেই যুক্ত থাকেন। তারাও কেউ ভাবেন না, উচ্ছ্বাসের প্রকাশ এমন হতে হবে কেন? সব জায়গায় নিয়ম না মানার একটা প্রবণতা রয়েছে। এটা গোড়া থেকেই পরিবর্তন করতে না পারলে শুধু আইন প্রয়োগ করে সমাধান করা যাবে না।

শুক্রবার থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনে মেতেছিল ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষ। ঢাকায় বেশিরভাগ ভবনের ছাদেই ছিল নানারকম আয়োজন। ফানুস ওড়ানো ও আতশবাজি পোড়ানো ছাড়াও অনেক স্থানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর ব্যবস্থা ছিল। কোথাও আবার স্বল্প পরিসরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। ছিল খাবারের নানা আয়োজন। তবে মধ্যরাতে আনন্দ ছাপিয়ে আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। একে একে নানা স্থানে ফানুস থেকে আগুন লাগার খবর আসতে শুরু করে।

ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা খালেদা ইয়াসমিন বলেন, দুটি ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নেভায়। এর মধ্যে ধোলাইখালের সরকার লেনের একটি পাঁচতলা ভবনের ছাদে রাত ১২টা ৩৯ মিনিট এবং মাতুয়াইলের স্কুল রোডে রাত সোয়া ১২টার দিকে আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। দুই জায়গাতেই আবাসিক ভবনের ছাদে আগুন লেগেছিল। অন্য ঘটনাগুলোয় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়রা আগুন নিভিয়ে ফেলেন। আগুনে বড় ধরনের ক্ষতি বা হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

পূর্ব রাজাবাজার এলাকার বাসিন্দা এক নারী জানান, পটকা-আতশবাজির তীব্র শব্দে তার এক মাস বয়সী সন্তান ঘুমাতে পারছিল না; বারবার ভয়ে কেঁপে উঠছিল। ভোর পর্যন্ত চলে এ অবস্থা। অনেক সময় এ ধরনের শব্দ বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য সমস্যা তৈরি করে। আরেক শিশু সন্তানের বাবা ক্ষুব্ধ হয়ে ফেসবুকে মধ্যরাতে লিখেছেন- ‘হ্যাপি নিউ ফায়ার’।

অন্যান্য বছরের তুলনায় শুক্রবার ঢাকার আকাশে আতশবাজির ঝলকানি, ফানুস ও সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাস বেশি দেখা যায়। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে আতশবাজি না ফুটানোর অনুরোধ করা হয়। এদিকে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ছিল নানা বিধিনিষেধ। গুলশান-বনানী, হাতিরঝিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাত ৮টার পর বহিরাগতদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠানেও ছিল নিষেধাজ্ঞা।

মজলুমের কণ্ঠ / ২ জানুয়ারি / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles