কৃষক ও কৃষি বাঁচাতে তরুণ কৃষিবিদ নিজেই কৃষক

রেজাউল করিম:

পড়ালেখা শেষ করে যে সময়টাতে চাকরির পেছনে ছুটার কথা, ঠিক সেই সময়ে কৃষক ও কৃষিকে বাঁচাতে লড়ছেন একজন তরুণ কৃষিবিদ। ‘পড়ালেখা শেষ হলেই চাকরি করতে হবে, চাকরি না হলে পড়ালেখা করাটা ব্যর্থ’ এমন ভাবনা পাল্টে দিয়েছেন তিনি। দেখিয়ে দিয়েছেন, অর্জিত জ্ঞানের সঠিক ব্যবহারই শিক্ষার সফলতা। উদ্যোক্তার মাধ্যমেও মেধার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো সম্ভব। এমনটা প্রমান করলেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া ইউনিয়নের গোমজানি গ্রামের তরুণ কৃষিবিদ শাকিল আহম্মেদ। শাকিল ওই গ্রামের মো. আব্দুল করিমের ছেলে। দেশের কৃষি ও কৃষক রক্ষায় নিজেই কৃষক হয়ে মাঠে কাজ করছেন। কৃষি ও কৃষকদের আধুনিকরণ করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তিনি। তাকে অনুসরন ও তার পরামর্শ নিয়ে স্থানীয় কৃষকরা ক্রমশ আধুনিক হচ্ছেন। অধিক লাভবান হচ্ছেন কৃষি কাজে। শাকিলের ধারণা, দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে কৃষিকে বাঁচাতে হবে,দেশের কৃষককে বাঁচাতে হবে। রাষ্ট্রের অন্তিম মূহুর্তে রাষ্ট্র বৈদেশিক খাদ্য রপ্তানি করতে ব্যর্থ হলে তখন দেশের মানুষের খাদ্যের যোগান দেবে কৃষক। সেই কৃষকদের আধুনিক করতে চাকরির পেছনে না ছুটে ছুটছেন কৃষি ও কৃষকদের পেছনে। বিসিএস করে কৃষি কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন নেই শাকিলের মনে। শাকিলের স্বপ্ন কৃষকদের আধুনিক করা।

সম্প্রতি ২০২০ সালে সালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (কৃষি) বিভাগে পড়ালেখা শেষ করেন। করোনাকালে শুরু করেন কৃষি জমিতে সবজি ও ফল চাষ। একই জমিতে ৮/১০ প্রকারের ফসল যৌথ চাষ করে কিভাবে পুরো জমিকে কাজে লাগানো যায় তা শিখিছেন শাকিল। প্রথমে স্কোয়াশ দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন শাকিল। এরপর তার প্রকল্পকে ক্রমশ বৃদ্ধি করছেন। বিষ প্রয়োগ ব্যতিত পোকা দমন, ক্ষতিকারক সার ব্যবহার না করে কম্পোস্ট সারের ব্যবহার, পোকা পালন করে মাছ, মুরগি ও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরি, মালচিং পদ্ধতিতে চাষাবাদে পানি ও সারের অপব্যবহার রোধ করা, অনলাইনে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে পরামর্শের মাধ্যমে আধুনিকরণ করে কৃষিকাজে বিশেষ ভূমিকা রেখে অল্প দিনেই প্রশংসিত হচ্ছেন এই তরুণ।

কৃষিবিদ শাকিল আহম্মেদ জানান, করোনাকালে যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল তখন পরিবার থেকে অল্প পুঁজি নিয়ে এক টুকরো জমিতে শুরু করেন স্কোয়াশ চাষ। আধুনিক চাষাবাদে ফলন হয় পর্যাপ্ত। ফলে প্রথম বছরেই অর্ধ লাখ টাকা লাভ করেন এক টুকরো জমি থেকে। ২০২১ সালের বন্যায় ডুবে যায় সবজির জমিগুলো। বসে না থেকে পুকুর কিনে মাছের ওপর বিনিয়োগ করেন। ফলে অর্থ সংকটে পড়েন তিনি। এসময় কিছু বিনিয়োগকারীর সাথে তার পরিচয় হয়। কিছু প্রফেসরদের সাথেও পরিচয় হয়। ওই সময় ফার্মনেট এশিয়া নামের একটি অনলাইন ভিত্তিক কোম্পানী চালু করেন তিনি। যার কাজ কৃষক- ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে সংযুক্ত রাখা। এখানেও সারা পান যথেষ্ট।

বর্তমানে স্কোয়াশ ৪২ শতাংশ, ক্যাপসিকাম ৪০ শতাংশ, শসা ৫০ শতাংশ, সমন্বিত মিশ্র ফল ও সবজি চাষ ১২৫ শতাংশ জমিতে চাষাবাদ করছেন। সমন্বিত সবজি চাষের একই জমিতে রয়েছে পেঁপে,টমেটো, শসা, রেড ক্যাবেজ, ব্রোকলি,রক মেলন তরমুজ, পাতাকপি, লাউ ও লাল শাক। একটি জমিকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে সমন্বিত চাষ শুরু করেন। ২৫৭ শতাংশ জমিতে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ৬ লাখ টাকা। ১০ লাখ টাকা বিক্রির টার্গেট নিয়ে কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে তার উৎপাদিত সবজি ও ফল স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়েও রাজধানীতে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় শতাধিক কৃষক শাকিলের পরামর্শ ও সহযোগিতা নিয়ে কৃষিকাজে ব্যাপক সফলতা পাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষক বাহাদুর, সেলিম মিয়া,কালাম মিয়া, সোহরাব মাস্টার জানালেন শাকিলের সহযোগিতার কথা।

শাকিলের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ:
পানি ও সারের অপচয় রোধে মালচিং পদ্ধতি চাষাবাদ বেছে নিয়েছেন শাকিল। মালচিং ফ্লিম পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে সারের অপচয় কম হয়। আগাছা কম হবে। আলো-বাতাস সহজেই প্রবেশ করতে পারবে। পলিথিন দিকে ঢেকে থাকায় পানিও কম লাগে। বাইরের পোকার আক্রমন থেকে শস্যকে রক্ষা করতে প্রতিটি জমিতে ৭ ফিট উচ্চতার নেট দিয়েছেন। এসব পোকা ৭ ফিটের উপর দিয়ে উড়তে পারে না। সেক্স ফেরোমোন ট্র্যাপ স্কিটি ট্যাাপের মাধ্যমে যৌবিক উপায়ে পোকা দমন করছেন। উর্বরতা বাড়াতে প্রাকৃতিক সার, কেঁচো স্যার, ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদন ও প্রয়োগ করছেন।

প্রতিটি শস্যের জন্য রেখেছেন বেকআপ প্ল্যান। একই জায়গায় একাধিক বীজ বপন করেন যাতে একটি বীজ বা চারা নষ্ট হলেও অপরটি থেকে যায়। পোকার আক্রমনের আগাম খবর জানতে আর্টিফিসিয়ালি ইন্টিলিজেন্ট (এআই) প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন তিনি। বাড়িতেই বøাক সোলজার ফ্লাই পালন করছেন তিনি। যার লাভা মাছ ও মুরগির জন্য উন্নত অর্গান খাবার। সবজির জন্য বাড়িতেই তৈরি করছেন কেঁচো সার।

কৃষক-কৃষি নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা:
কৃষিবিদ হয়েও বিসিএস বা অন্য কোন চাকরির কথা ভাবছেন না শাকিল। তিনি আজীবন কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে কাজ করতে চান। তার ভাবনাগুলোকে বিশ^ব্যাপি ছড়িয়ে দিতে চান। ফার্মনেট এশিয়া কোম্পানীর মাধ্যমে কৃষকের জন্য ১০০জন কৃষিবিদ নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। শস্য, ফল, সাছ,সবজি ও পোল্টিসহ পুরো কৃষিকে আধুনিক কৃষির সাথে সমন্বয় করানোই ফার্মনেটের প্রধান লক্ষ। সয়েল সেন্সর ডেভোলপ করার ভাবনার রয়েছে তার। ভবিষ্যত এগ্রো ট্যুরিজম করার ইচ্ছে নিয়েও কাজ করছেন। কৃষির প্রতি টান থাকবে সব শ্রেণির মানুষের। তার ট্যুরিজম সেন্টারে এসে সরাসরি ফল ছিড়বে মানুষ। গাভির দুধ পাবে এখানে। প্রকৃতি উপভোগ করবে। আর এসব নিয়ে সারা জীবন কৃষকের পাশে থাকতে চান শাকিল। ২০২৪ সালের মধ্যে দেশের একহাজার কৃষকদের নিয়ে কাজ করার কথা ভাবছেন। এমন কি ২০০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করার ইচ্ছে রয়েছে তার। ইতোমধ্যে চরাঞ্চলের শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। বীজ বপন ও সবজি-ফল তোলার কাজে নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।

শাকিল আরও বলেন, কৃষি অফিসার হলে একটি নিদৃষ্ট এলাকার কৃষকদের উপকার করতাম। অঞ্চল বেধে কাজ করার সুযোগ পেতাম। এখন অনলাইনে বিশ্বব্যাপী কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার কোম্পানীকে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানী করার চিন্তা করছেন। প্রযুক্তিগুলোকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছেন। তার এই এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। কৃষি মন্ত্রনালয় ও তথ্য মন্ত্রনালয়ের প্রণোদনার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি সহজলভ্য করা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের নিবিরতা প্রকল্পের আওতায় আধুনিক সেডনেট হাউজ প্রকল্প সহযোগিতা পাওয়ারও আবেদন জানান শাকিল।

দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোয়েব মাহমুদ বলেন, শাকিল একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমি শাকিলে কৃষি প্রকল্পগুলো কয়েকবার পরিদর্শণ করেছি। তার এসব উদ্যোগের পাশে সবসময় কৃষি অফিস থাকবে। ইতোমধ্যে নানা ধরণের পরামর্শ শাকিলকে দেওয়া হচ্ছে। শাকিলের এমন উদ্যোগ অবশ্যই প্রসংশনীয়।

মজলুমের কণ্ঠ / ১১ জানুয়ারি / আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles