বিষাক্ত আনারস দখল করে নিয়েছে বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক : বিষাক্ত আনারস দখল করে নিয়েছে বিশ্বখ্যত টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মধুপুরের পঁচিশমাইল জলছত্র আনারসের হাট। এতে করে দিনদিন এই হাট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ বর্তমানে সাধারণ মানুষ বিষমুক্ত ফল খেতে চায়। তারপরও আনারস চাষীরা অধিক লাভের আশায় তাদের চাষ করা ফলে বিষাক্ত ক্যামিকেল ব্যবহার করছে। এতে করে আনারস অনন্তত ৩ থেকে ৪ দিনেই বড় ও পেকে যাচ্ছে। একারনে সেই বিষযুক্ত ফল কিনে বাজারে বিক্রি করতে অনেকটাই হিমসিম খেতে হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায় শতকরা ১০টি এবং বিষমুক্ত আনারস ১৫/২০টি পচে যায়। এতে করে তাদের ব্যবসায় লাভের চেয়ে লোকসানের হিসেবটাই বেশী দেখা যায়।

সরেজমিন মধপুরের বনাঞ্চলের আলোকদিয়া, আউসনারা, দিগর বাইদ, অরনখোলা, জলছত্র, মোটের বাজার, গারো বাজার, রসুলপুর, পঁচিশমাইল, ইদিলপুর সহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে আনারসের জমিতে কৃষকদের কর্ম ব্যস্ততা। তারা এখন ফল কাঁটতে ব্যাস্ত। সূর্য্য উঠার আগেই কৃষকরা ভ্যান, রিক্সা সহ বিভিন্ন যানবাহনে খাচি ভর্তি করে আনারস বাজারে নিয়ে এসে বেঁচাকেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। মধুপুরের আনারস স্বাধে গন্ধে অতুলনীয় হওয়ায় ঢাকা, কুমিল্লা, পাবনা, রাজশাহী, সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আনারস কেনার জন্য ব্যাপারিরা ভির জামাচ্ছে মধুপুরের পঁচিশমাইল জলছত্র আনারসের বাজারে।

এদিকে চাষীরা আনারস বিক্রি করে সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে লাভবান হলেও পাইকাররা আনারস চড়া দামে কিনে নিয়ে ক্যামিকেল আতংকে তা পরবর্তীতে বিক্রি করতে হিমসীম খেতে হচ্ছে। মুলধন ঘাটতির কারনে ব্যবসা করতে কষ্টসাদ্ধ হয়ে পরেছে ব্যবসায়ীদের।

যতই দিন যাচ্ছে ততোই এই আনারসের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আগের তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নেই সেই সাধ আর গন্ধ। আনারস চাষে কৃষকদের ঔষধ প্রয়োগে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষনের অভাবে এবং ঔষধ বিক্রেতাদের কু-পরামর্শে নানা প্রকারের ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সময়ে অতি লাভের আশায় কৃষক ৩/৪ মাসেই আনারস বড় করে ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে পাকিয়ে ফেলছে। ফলে আনারস দেখতে সুন্দর দেখা গেলেও এর স্বাদ গন্ধ কোনটাই পাওয়া যাচ্ছেনা। যে কারনে মানুষ আনারস কিনতে গিয়ে ক্ষতিকর ঔষধ প্রয়োগের কথা চিন্তা করে এর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। আনারসের বাম্পার ফলনে চাষিদের আনন্দিত হওয়ার কথা থাকলেও দেখা যায় হতাশার ছাপ। যে আনাসের মূল্য থাকার কথা ছিল ৫০/৬০ টাকা সেই আনারস চাহিদা না থাকায় বিক্রী করতে হচ্ছে ১০/১৫ টাকায়।

গারোবাজারের কৃষক আনছের আলী মিয়া জানান, ৭০ বিঘা জমিতে এবার তিনি আনারসের চাষ করেছেন। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে পাঁচশ আনারস বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন। তবে তিনি অসংকোচবোধ করে বলেন আনারসে ক্যামিকেল না দিলে প্রতিদিন হয়তো এক থেকে দুইশ আনারস বাজারে বিক্রি করতে হতো। তাই তিনি অধিক লাভের আসায় আনারসে ক্যামিকেল দেন।

মহিষমাড়া গ্রামের খন্দকার মোতালেব হোসেন জানান, বিষমুক্ত আনারস আকারে অনেক ছোট। আর এর রঙ দেখে ক্রেতারা কিনতে চায় না। এই আনারস বাগান থেকে কেটে দুই-তিনদিনের বেশী রাখা যায় না। কিন্তু ফরমালিনযুক্ত আনারষ ৭/৮দিন রাখা যায়। এতে ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কোন অসুবিধা হয় না। আর এর আকারও অনেক বড় এবং রঙ গারো হলুদ হওয়ায় সাধারণ ক্রেতারা আকৃষ্ট হয়। লাভও অনেক বেশী। তাই বাধ্য হয়েই তার মতো প্রায় চাষীরাই আনারসে ফরমালিন দেন।

নাটোর থেকে আসা বেপারী আহসান হাবিব জানান, তিনি প্রতিবছর মধুপুর আসেন আনারস কিনতে। এবারও তিনি এসেছেন। কিন্তু আগের তুলনায় এবার বাজারে আনারসের চাহিদা অনেক কম। এর কারন ব্যখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা এখন আর বিষযুক্ত কোন ফলই খেতে চান না। তবুও কৃষকরা বেশী লাভের আশায় ফলে ফরমালিন দিয়ে অল্প দিনে বিক্রি করার জন্য আনারস বড় করে ফেলছে। আর একটি বড় আনারস প্রতিটি ১২ থেকে ১৫টাকায় বিক্রি করতে পারছেন কৃষকরা। অথচ বিষমুক্ত আনারস আকারো অনেক ছোট, রঙও তেমন ভাল নয়। কিন্তু খেতে খুব সুস্বাদু। দামও খুব কম, প্রতিটি বিষমুক্ত আনারস ৪ থেকে ৮টাকায় বিক্রি করে কৃষক। তারপরও সাধরণ মানুষ আকারে ছোট ও দেখতে ভালো না দেখার কারনে এগুলো কিনতে চায় না। আর এই বিষমুক্ত আনারস বেশীদিন রাখাও যায় না। তাই বাধ্য হয়েই সবাই বিষযুক্ত আনারসই বিক্রি বা চাষ করছেন।

মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুক্কাদির আজিজ বাংলানিউজকে জানান, আনারসে মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ প্রয়োগ না কারার জন্য ব্যাপক প্রচারনা এবং কৃষি সমাবেশ করা হয়েছে। আনারসে ঔষধ প্রয়োগের বিষয়ে কেউ অভিযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বাংলানিউজকে জানান, আনারসের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে এই ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। তবে পরিমান মতো ঔষধ প্রয়োগ করলে মানব দেহের কোন ক্ষতি হবে না। মাত্রাতিরিক্ত ঔষধ প্রয়োগ না করার জন্য কাজ করছেন বলে তিনি জানান।

এবছর নয় হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। আর এর উৎপাদন লক্ষ মাত্রা রয়েছে দুই লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন।

Related Articles