টাঙ্গাইলে ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি

নিজস্ব প্রতিবেদক : টাঙ্গাইল রেলওয়ে স্টেশনে লাইনে দাড়িয়ে সিটসহ টিকিট পাওয়া না গেলেও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কালোবাজারির মাধ্যমে সিটসহ টিকিট মিলে। যাত্রীরা ২০-২৫ মিনিট লাইনে দাড়িয়ে টিকিট না পেলেও টাকার বিনিময়ে তাৎক্ষনিক সিটসহ টিকিট পাওয়া যায় এই স্টেশনে। ফলে ভোগান্তীর স্বীকার হচ্ছে সাধারণ যাত্রীরা। মুখচেনা প্রভাবশালীর কালোবাজির মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে সিটসহ টিকিট পেলেও সাধারণ যাত্রীরা পায় না। ফলে টাঙ্গাইল থেকে দাড়িয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাতায়ত করে যাত্রীরা। এতে করে তারা অনেক কষ্টের স্বীকার হন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এই ভোগান্তীটা একটু বেশি। এই অবৈধ কালোবাজারির সাথে জড়িত রয়েছে সহকারী স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে স্টেশনের কুলি। শুধু সহকারী স্টেশন মাস্টার ও কুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানে ট্রেনের টিকিট মিলে। তাই অবৈধভাবে কালোবাজারির ছাড়া বৈধ পন্থায় টিকিট বিক্রির দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের ট্রেন যাত্রীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টাঙ্গাইল স্টেশনের সহকারি স্টেশন মাস্টার, বুকিং সহকারী, বুকি মাস্টার, টি ম্যান, পোর্টার, টিকেট মাস্টার ও কুলিরাও কালোবাজারি টিকিটের সাথে জড়িত রয়েছে। এর আগে সহকারি স্টেশন মাস্টার মো. সোহেল, টিকিট মাস্টার মো. আশরাফসহ তিনজন কালোবাজির মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করার সময় গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের নিকট আটক হয়। পরে মুছলেকা দিয়ে তারা ছাড়া পায়। শুধু সোহেল নয়, এই টাঙ্গাইল স্টেশনের বুকিং সহকারী মো. হান্নান সরকার, টিকেট মাস্টার মো. আরিফ, মো. আশরাফুল, টি ম্যান মো. তারেক, মো. ফজলুল হক ও পোর্টার মো. বাদশা কালোবাজারি টিকিটের সাথে জড়িত রয়েছে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশনের মাস্টার আ. মান্নান, বুকিং সহকারী মো. রেজাউল, মো. শরিফুল ইসলাম, টিকিট মাস্টার মো. রিপন ও মির্জাপুর স্টেশন মাস্টার মো. কামরুল, স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. বকুল আহমেদ কালোবাজারি টিকিটের সাথে জড়িত রয়েছে।


সরেজমিনের টাঙ্গাইল স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বুকিং অফিসের সামনে ট্রেন যাত্রীদের দীর্ঘ সাড়ি। সকলে লাইনে দাড়িয়ে টিকিট কিনছেন। বুকিং অফিসের দরজায় লেখা ‘কাউন্টারের ভিতরে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিশেধ’। তবে স্টেশনের কুলি প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে বুকিং মাস্টারদের সহযোগিতায় প্রবেশ করছে ও বের হচ্ছে। এমন সময় কুলি মো. মাসুদ, টোটন মিয়া ও টুটুল মিয়াকে চোখে পড়লো। তিন জনেই লুঙ্গি পড়া হাতে মোবাইল। মাঝে মাঝে কার সাথে যে কথা বলে ভিতরে যাচ্ছে, টিকিট এনে অন্য জায়গায় গিয়ে তাদের কাঙ্খিত ব্যক্তিকে অধিক টাকার বিনিময়ে টিকিট দিচ্ছে। এদিকে লাইনের যাত্রীরা দাড়িয়ে থেকে হতাশ হচ্ছে সিটসহ টিকিট না পেয়ে। লাইনে দাড়িয়ে থাকা যাত্রীরা টিকিট না পেলেও ওই তিন কুলিকে বার বার বুকিং অফিসে যাতায়াত করতে দেখা যায়।


মো. হযরত আলী বলেন, আমি ২০ মিনিট লাইনে দাড়িয়ে থেকেও সিটসহ টিকিট পাইনি। আসন সংখ্যার চেয়ে যাত্রী বেশি হলেও এই স্টেশনের যাদের লোক আছে ও যারা প্রভাবশালী তারাই একমাত্র সিটসহ টিকিট পায়। তাছাড়া অন্য কেউ পায় না। আমি কালোবাজারি টিকিট বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।

প্রতিমা রাণী বলেন, আমি মাঝে মাঝেই ঢাকায় যাতায় করি। এই স্টেশনের কুলি মো. মাসুদ মিয়া আমাকে টিকিট ব্যবস্থা করে দেয়। আজকেও সে ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ১১৫ টাকার টিকিট ১৮০ টাকা দিয়ে কিনেছি।

রুস্তম আলী বলেন, যখন টিকিট মাস্টার মো. আশরাফের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে টিকিট কিনি তখন সিট পাই। আজকে অতিরিক্ত টাকা দেই নাই বলেন সে সিট ছাড়া টিকিট দিয়েছে। এর প্রতিবাদ করলে সে খারাপ আচরণও করে আমার সাথে। সময়বুকিং মাস্টার এতো খারাপ ব্যবহার করে তা কল্পনার বাইরে। তাদের ব্যবহার শিখতে হবে কার সাথে কেমন আচরন করতে হয়।

আফজাল হোসেন বলেন, টাঙ্গাইল স্টেশনে সিটসহ টিকিট পাওয়া খুব সহজ। কিছু টাকা বাড়িতে দিলেই সিটসহ টিকিট পাওয়া যায়। আমি টিকিট মাস্টার আরিফের নিকট হতে টিকিট ব্যবস্থা করেছি।

স্টেশনের টি ম্যান ফজলুল হক বলেন, আপনার যে কোন সময় যেকোন ট্রেনের টিকিট লাগলে আমাকে জানাইয়েন আমি সিটসহ টিকিক ব্যবস্থা করে দিবো। তবে টিকিটের দামের চেয়ে কিছু টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। সহকারি স্টেশন মাস্টার সোহেলের সহযোগিতায় টিকিট মাস্টার কিছু টিকিট ব্যবস্থা করে থাকে। সেই টিকিট আমি প্রতিদিন ১০-১২ টা করে পেয়ে থাকি।

টুটুল ও মাসুদ মিয়া নামের দুই কুলি বলেন, আগে স্টেশনে অনেকেই বড় বড় ফ্রীজ, মোটর সাইকেল আলমাড়ী নিয়ে আসতো। সেই কাজ করে আমরা অনেক টাকা আয় করতাম। এখন আর আগের মতো কাজ নেই। তাই সহকারী স্টেশন মাস্টার ও টিকিট মাস্টারদের সহযোগিতায় কিছু টিকিট ব্যবস্থা করে থাকি।

স্টেশনের পাশের দোকানদার মো . আজহার আলী বলেন, এখন আর আগে মতো টিকিট ব্যবস্থা করি না। পরিচিত ছাড়া কাউকে টিকিটও দেই না। প্রশাসনের লোক থাকে। তারা আমাকে নজরদাড়ির মধ্যে রাখছে। আপনি মোবাইল নাম্বার নিয়ে যান। টিকিট লাগার কিছুক্ষণ আগে জানাইয়েন ব্যবস্থা করে দেইরো।

টিকিট মাস্টার মো. আরিফ বলেন, পরিচিত মানুষ কেউ রিকুয়েস্ট করলে তাদের টিকিট ব্যবস্থা করে দেই। তাছাড়াও কাউকে কোন প্রকার টিকিট ব্যবস্থা করে দেই না।

এ বিষয়ে টাঙ্গাইলের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার মো. সোহেল বলেন, আগের চেয়ে কালোবাজারের টিকিট দেওয়া অনেক কমে গেছে। অন্যদিকে স্টেশনের কুলি ও পাশের দোকানদারা যে টিকিট সংগ্রহ করে সেটা টিকিট মাস্টারদের যোগসাজসে করে থাকে। আমরা এর আগে কোন গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে আটক হয়নি ও কাউকে মুছলেকা দিয়ে ছাড়াও পায়নি।

Related Articles