ভূঞাপুর চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সোহরাব আলী স:প্রা: বিদ্যালয়

এসএম আওয়াল মিয়া:

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের রেহাই গাবসারা গ্রামটি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। এ অঞ্চলের পাশেই যমুনা নদী। বন্যার সময় প্লাবিত হয় এই গ্রাম। ভূঞাপুর উপজেলা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে এ গ্রামের অবস্থান। গোবিন্দাসী খেয়া ঘাট থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার নৌকা যোগে যেতে হয় এই গ্রামে। এই গ্রামে শিক্ষার হারও খুব কম। প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত ছিলো এই গ্রামের শিশুরা। তিন কিলোমিটার দূরে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল না থাকায় সে স্কুলে যায়নি রেহাই গাবসারাসহ আশেপাশের গ্রামের শিশুরা। ফলে ছোট সময় থেকেই কর্মমুখী হয়ে পড়তো ওই এলাকার শিশুরা। কেউ মাছ ধরতো, কেউ নৌকা চালাতো, কেউ ইটভাটায় কাজ করতো আবার কেউ দোকানের কর্মচারি হিসেবে কাজ করতো। ২০১৪ সালে রেহাই গাবসারা গ্রামে সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষার হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রচেষ্টায় শিশুরা শিক্ষা গ্রহণ করছে।

বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ছোট মাঠে ধর্মের বানী পাঠ, জাতীয় সংগীতের সুরের মুর্ছনায়। দেশ ও জাতি গঠনে অবদান রাখাসহ নিজেকে একজন সুস্থ ধারার নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার শপথ নেয়। এভাবেই প্রতিদিন বিদ্যালয় মাঠের শারীরিক চর্চা শেষে শিক্ষার্থীরা ফিরে যায় টিনশেড ঘরের সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষে। এখন বিদ্যালয়টি শুধু পাঠদান কেন্দ্র নয়, হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীবান্ধব আনন্দ বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে। শ্রেণিকক্ষের সাজানো শিশুবান্ধব পরিবেশে চলে পাঠদান। শিশু শ্রেণিতে পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিশুদের খেলায় মাতিয়ে রাখেন। এরমধ্যেই চলে বাংলা-ইংরেজী বর্নমালা, গণনা ও ছড়া-কবিতা শেখানো। কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলা নিয়মিত পড়াশোনা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে প্রতিবছরই তারা ভালো ফলাফল করতে পারছে। সেই সঙ্গে সন্তানদের ধারবাহিক ফলাফলে অভিভাবকরাও সন্তু‘ষ্ট।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে শিক্ষানুরাগী মো.সোহরাব আলী প্রথমে নিজ উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রেহাই গাবসারা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটি টিনের ঘরে ৪জন শিক্ষক নিয়ে শুরু হয় বিদ্যালয়ের পাঠদান। শুরুর দিকে তেমন শিক্ষার্থী ছিল না। পরিচালনা পর্ষদসহ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বছর ঘুরতেই বেড়ে যায় শিক্ষার্থী। কিন্তু নিজ উদ্যোগে দীর্ঘদিন চলার পর বিদ্যালয়টি অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর পরবর্তীতে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর ‘বিদ্যালয় বিহীন গ্রামে ১৫ শ বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পের অধীনে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিদ্যালয়ের টিনের ঘর নির্মাণ করার জন্য ২০১৪ সালে ২১ লক্ষাধিক টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ১৭২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। ২০১৫-১৬ সালে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের নিজ অর্থায়নে স্কুল ড্রেস ও খন্ডকালীন দুই শিক্ষক নিয়োগ, আলাদা একটি শ্রেণী কক্ষ, শহীদ মিনার, ফুলের বাগান করেছেন মো. সোহরাব আলী। এছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন তিনি।

সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রেহাই গাবাসারা, গোবিন্দগঞ্জ, গোবিন্দপুর, পুংলিপাড়া, ছোট নলছিয়াপাড়াসহ আশে পাশের আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী লেখা পড়া করে। গুরুত্ব দেওয়া হয় নিয়ম শৃঙ্খলা ও পড়াশোনা দিকে। সাফল্যও এসেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। লেখাপড়ার পাশাপাশি নিয়মিত সংস্কৃতির চর্চার কারণে উপজেলা অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় স্কুলটি ব্যাপক পরিচিত লাভ করেছে। বর্তমানে স্কুলটিতে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে ৫ জন অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষিকা। চলতি বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী নির্বাচিত হয়েছেন উপজেলার ১০৭ নং সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. সোহরাব আলী। উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভায় তাকে শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী নির্বাচিত করা হয়। তিনি উপজেলার রেহাই গাবসারা গ্রামের মৃত শুকুর মামুদের ছেলে ও জেলা ইউনিয়ন পরিষদ সচিব সমিতি (বাপসা) সভাপতি এবং অলোয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। এর আগেও তিনি ২০১৮ সালেও শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্র রনি সেক বলেন, স্কুলের সামনে খেলার মাঠ আছে। ক্লাস বিরতির সময় আমরা সবাই মিলে খেলাধুলা করি। স্যার ও ম্যাডামরা খুব স্নেহ করে আমাদের। আমাদের গান শিখায়, কবিতা আবৃত্তি শিখায়। আমাদের সাথে মাঠে খেলাধুলা করে।
পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী লিজা আক্তার বলেন, বন্যার সময় স্কুল মাঠ ও শ্রেণী কক্ষে পানি প্রবেশ করায় স্কুল বন্ধ থাকে। বহুতল ভবণ হলে বন্যার সময়ও আমাদের ক্লাশ হবে। তাই আমাদের বিদ্যালয়ে বহুতল ভবনের খুব প্রয়োজন।

রেহাই গ্রাবসরা গ্রামের মহিলা অভিবাবক রাহেলা বেগম বলেন, আগে আমাদের গ্রামের শিশুরা লেখা পড়া করতে পারেনি। তিন কিলোমিটার দূরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিলো। সেখানেও যাতায়াত করতে খুব কষ্ট হতো। আর বন্যার সময় এক থেকে দেড় মাস স্কুলে যেতে পারেনি শিক্ষার্থীরা। ফলে শিশুরা ঝড়ে পড়তো।
ওই এলাকার ৬৬ বছরের সুরুজ্জামান সেক বলেন, আগে আমাদের গ্রামে কোন স্কুল ছিলো না। ফলে আমাদের ছেলে মেয়েকেও লেখা পড়া করাতে পারিনি। সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হওয়ার পর এই স্কুলে আমার নাতি নাতনি লেখা পড়া করে। তারা খুব সুন্দর কথা বলতে পারে। হাতের লেখাও খুব সুন্দর। সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকলে আমার ছেলে মেয়েদের মতো তারা লেখা পড়া থেকে বঞ্চিত হতো।

সহকারি শিক্ষিকা মোছা. শামছুন্নাহার বলেন, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে রাজী নয় কোন শিক্ষার্থী। বাড়ির চেয়ে বিদ্যালয় এখন তাদের প্রিয়। প্রতি বছর ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী মো. সোহরাব আলী বলেন, ১৯৮৮ সালে বিএ পাশ করি। ওই সময়ে আমার গ্রামের অধিকাংশ মানুষই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলো। তখন থেকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম গ্রামের পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে হবে। সেই চিন্তা চেতনা মাথায় নিয়ে অবশেষে ১৯৯৪ সালে নিজস্ব ৩০ শতাংশ জায়গায় স্কুল শুরু করি। দীর্ঘদিন নিজ খরচে বিদ্যালয়টি চলার পর রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যার্থ হয়ে কয়েক বছর প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ছিলো। অবশেষে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর ‘বিদ্যালয় বিহীন গ্রামে ১৫ শ বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পের অধীনে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে ১৭২ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। স্কুল শুরুর প্রথম দিকে শিক্ষার্থীদের গরমের হাত থেকে রক্ষা করা জন্য নিজ খরচে সোলারের মাধ্যমে প্রতিটি শ্রেণী কক্ষে ফ্যানের ব্যবস্থাও করে দিয়েছি। ২০১৫-১৬ সালে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের নিজ অর্থায়নে স্কুল ড্রেস ও খন্ডকালীন দুই শিক্ষক নিয়োগ, আলাদা একটি শ্রেণী কক্ষ, অবিভাবকদের বসার জন্য স্কুল মাঠে বটগাছের চারিদেক ইট দিয়ে বেঞ্চ তৈরি, শহীদ মিনার, ফুলের বাগান করেছেন মো. সোহরাব আলী। এছাড়াও বিভিন্ন পরীক্ষায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর ৫জন শিক্ষক বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করেছি। বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে। টিনশেড ঘরের ছোট কক্ষে দুই শিফটের শিক্ষার্থীদের পাঠদানে সমস্যা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের চারিদিকে সীমানপ্রাচীরসহ একটি ভবন হলে পাঠদানে সুবিধা হত। পাশাপাশি আর তিন জন শিক্ষক হলে ভাল হয়।
তিনি আরও বলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়তে হয় না। ক্লাসের মাধ্যমেই ছাত্র-ছাত্রীদের সকল সমস্যা সমাধান করা হয়। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে স্কুল থেকে বিনামূল্য শিক্ষা উপকরণ প্রদান করা হয়।

ভূঞাপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ পারভীন বলেন, রেহাই গাবসারা একটি গণবসতি গ্রাম। চরাঞ্চলের অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে সোহরাব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখা পড়ার মান অনেক ভাল।প্রতিকূল পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও স্কুলটি ভাল চলে।

(এম কন্ঠ/আর.কে/২৪ডিসেম্বর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles