ওয়াশিং–ডাইংয়ে দূষিত বুড়িগঙ্গা

৩০ বছর আগেও বুড়িগঙ্গার পানি ফকফকা আছিল। এখন কালা কুচকুচা। হাজারীবাগের ট্যানারি সরকার উঠায়া নিছে। কালীগঞ্জের ডাইং কবে উঠায়া নিব?’ এই প্রশ্ন কেরানীগঞ্জের বাড়িগঙ্গার তীরের কালীগঞ্জ গ্রামের আবদুস সালামের।

আশপাশে চোখ রাখলেই বোঝা যায় আবদুস সালামের এই আকুতির কারণ। ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার রঙিন বর্জ্য সরাসরি পড়ছে নদীতে। কেরানীগঞ্জ ওয়াশিং মালিক সমিতির তথ্য হলো, এ এলাকায় বুড়িগঙ্গার পাড়ে তাদের সমিতিভুক্ত কারখানা আছে ৭২টি। একটি কারখানাতেও বর্জ্য শোধনের (ইটিপি) ব্যবস্থা নেই। তবে সমিতির বাইরেও অনেক কারখানা আছে এই এলাকায়। এরপর সবচেয়ে বেশি কারখানা আছে শ্যামপুর-কদমতলী শিল্প এলাকায়। সেখানে কারখানার সংখ্যা ৫০টি, যাদের বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় পড়ে।

বুড়িগঙ্গায় মিশছে শ্যামপুর-কদমতলী শিল্পাঞ্চলের ডাইং কারখানার তরল বর্জ্য। ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরি এলাকা থেকে গত ২৬ মে ছবিটি তোলাপরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৬০ হাজার কিউমেক (ঘনমিটার প্রতি সেকেন্ডে) অপরিশোধিত তরল বিষাক্ত বর্জ্য বুড়িগঙ্গায় পড়ে। এর মধ্যে ওয়াশিং ও ডাইং কারখানার বর্জ্যই প্রধান। আর হাজারীবাগের ট্যানারি থেকে প্রতিদিন তরল বর্জ্য নদীতে পড়ত ২২ হাজার কিউমেক মিটার। ৯০০ কিউমেক মিটার গৃহস্থালির বর্জ্য এখনো প্রতিদিন যায় বুড়িগঙ্গায়।

সরকারি হিসাবে বুড়িগঙ্গায় ২০ শতাংশ দূষণ ঘটাত হাজারীবাগের ১৫৪টি ট্যানারি। বহু বছরের চেষ্টায় সম্প্রতি এসব কারখানা বন্ধ করে সাভারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বুড়িগঙ্গার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ দূষণের জন্য দায়ী কোরানীগঞ্জ ও শ্যামপুর-কদমতলী শিল্প এলাকার ১২২টি ডাইং-ওয়াশিং কারখানা। দুই সমিতির এই হিসাবের বাইরেও আছে কিছু কারখানা।

বুড়িগঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে চর মীরেরবাগের ৮০ বছরের বৃদ্ধ জেলে ইন্দ্রজিৎ রাজবংশী বললেন, ‘ডাইং বুড়িগঙ্গা শেষ করে দিল। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা লাল-নীল বিষাক্ত পানি পড়ছে বুড়িগঙ্গায়।’

এ অভিযোগের বিষয়ে দ্বিমত নেই কেরানীগঞ্জের ওয়াশিং মালিক সমিতির সভাপতি কাজী আবু সোহেল ও শ্যামপুর কদমতলী শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার। তাঁরা প্রথম আলোকে বলেন, কোনো ওয়াশিং ও ডাইং কারখানায় ইটিপি নেই। এতে যে বুড়িগঙ্গার পানি দূষিত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

কারখানার তরল বর্জ্যে ভেসে গেছে শ্যামপুর-কদমতলী শিল্পাঞ্চলের সোনারগাঁ ডাইংয়ের সামনের সড়ক। ছবিটি গতকাল তোলাকেরানীগঞ্জের ওয়াশিং মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এখানকার প্রতিটি কারখানায় দিনে ২৫ থেকে ৩০ হাজার লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। কাপড় রং করার পর এসব পানি গিয়ে পড়ে বুড়িগঙ্গায়। এ হিসেবে কেরানীগঞ্জ এলাকার কারখানাগুলো থেকে প্রতিদিন অন্তত ১৮ লাখ লিটার বিষাক্ত তরল বর্জ্য মিশছে বুড়িগঙ্গায়। কেরানীগঞ্জের এসব কারখানায় জিনস প্যান্ট, টি-শার্ট, গেঞ্জি, জ্যাকেট, সোয়েটারসহ বিভিন্ন কাপড় ওয়াশ করা হয়।

এর মধ্যে আগানগর এলাকায় আছে সবচেয়ে বেশি ২৩টি ওয়াশিং কারখানা। চুনকুটিয়া ও শুভাঢ্যায় ১৭টি, চর কালীগঞ্জ ও খেজুরবাগে ১৩টি, কালীগঞ্জে ৯টি, হাসনাবাদ ও দোলেশ্বরে ৫টি, জিঞ্জিরায় ৪টি, পার গেন্ডারিয়ায় ২টি ও খোলা মোড়ায় ১টি ওয়াশিং কারখানা আছে।

শ্যামপুর-কদমতলী শিল্পাঞ্চলে সরেজমিনে দেখা যায়, বেশির ভাগ কারখানার সামনের রাস্তা-নালায় তরল বর্জ্যের স্রোত। সোনারগাঁও ফেন্সি প্রিন্টিং অ্যান্ড ডাইং কারখানার সামনের রাস্তায় গতকাল দেখা যায়, কারখানার তরল বর্জ্যে পুরো রাস্তা ডুবে আছে। একই অবস্থা দেখা গেছে আল মক্কা ডাইংয়ের সামনে। আর এসবের শেষ গন্তব্য বুড়িগঙ্গা। শ্যামপুরের বন্ধ হয়ে যাওয়া ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির পাশের নালা এবং কদমতলী বাজার এলাকার আরেকটি নালা দিয়ে সব কারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে বুড়িগঙ্গায়। এখানকার কারখানাগুলো বড় হওয়ায় তরল বর্জ্যের পরিমাণ কেরানীগঞ্জের চেয়ে বেশি।

কারখানার তরল বর্জ্য নালায়। ছবিটি শিল্পাঞ্চলের ১৩ নম্বর সড়ক থেকে তোলাশ্যামপুর-কদমতলী শিল্প সমিতির নেতারা জানান, পাঁচ বছর আগে তাঁদের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন (ওয়াসা) কর্তৃপক্ষকে কারখানার বর্জ্য শোধনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু ওয়াসার পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান প্রথম আলোকে বলেন, ওয়াসার পয়োশোধনাগারে শিল্প বর্জ্য শোধন সম্ভব নয়। আইন অনুযায়ী, প্রতিটি কারখানাকে ইটিপি করতে হবে।

কদমতলী শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় ইটিপি করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের আগানগরের ওয়াশিং কারখানার তরল বর্জ্য বুড়িগঙ্গায়। ছবিটি গত ফেব্রুয়ারিতে তোলাপরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘গুটিকয়েক মানুষ নিজেদের স্বার্থে বুড়িগঙ্গা নদী শেষ করে দিচ্ছে। একাধিকবার সেখানকার কারখানাগুলো সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে। এগুলো করলে শুরু হয় রাজনীতি। বিকল্প দরজা খুলে তারা কারখানা চালিয়ে যায়।’

পরিবেশ অধিদপ্তরের নথিপত্রে দেখা যায়, গত সাত বছরে বুড়িগঙ্গাদূষণের দায়ে কেরানীগঞ্জের অন্তত ৫০টি কারখানাকে জরিমানা করা হয়েছে। আর শ্যামপুরে করা হয়েছে কমপক্ষে ২৫টি কারখানাকে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (ঢাকা অঞ্চল) মো. আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন-চার মাস আগে তাঁরা অভিযান চালিয়ে কেরানীগঞ্জে অন্তত ১৮টি কারখানা সিলগালা করে দেন। কিন্তু স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতার নির্দেশে সেসব কারখানা আবার উৎপাদন শুরু করেছে।’

শ্যামপুর-কদমতলীর ডাইং কারখানার বর্জ্য নালা দিয়ে এভাবেই মিশছে বুড়িগঙ্গায়। ছবিগুলো তুলেছেন আসাদুজ্জামানএ বিষয়ে জানতে চাইলে মালিক সমিতির সভাপতি আবু সোহেল বলেন, কেরানীগঞ্জের কারখানাগুলো উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। তাই তাদের পক্ষে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি জানান, কেরানীগঞ্জের রুহিতপুরে ৪০ বিঘা জমি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে সব কারখানা সরিয়ে নেওয়া হবে।

আবু সোহেল বলেন, ‘হাজারীবাগকে সময় দেওয়া হয়েছে বহু বছর। অথচ আমাদের কারখানাগুলো যখন-তখন সিলগালা করে দেওয়া হয়। জরিমানা করা হয়। সময় দিলে আমাদের এগুলো ভালোভাবে সরিয়ে নিতে পারব। আমাদের যেন হয়রানি না করা হয়।’

ওয়াশিং ও ডাইং কারখানাগুলোর নদীদূষণের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর যে স্বীকার করেছে, বুড়িগঙ্গাকে দূষণ করছে ডাইং-ওয়াশিং কারখানা, তা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এটা আমরা ২০ বছর ধরে বলছি। প্রচলিত আইন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিরাপত্তা বিধিমালা, ১৯৯৭ অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা প্রতিটি ডাইং-ওয়াশিং কারখানাকে বর্জ্য শোধনাগার করতে হবে। অর্থাৎ কোনো বর্জ্য শোধন ছাড়া নদীতে ফেলা যাবে না। আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধ করতে হলে এর বিকল্প কিছু নেই।

Related Articles