নতুন আইএস আসছে!

দুই বছর আগেও তাদের নাম খুব একটা একটা শোনা যায়নি। এমন এক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শহরের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ফিলিপাইনের সরকার ও সেনাবাহিনী। সম্প্রতি আরেকটি শহরে ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে ফিলিপাইনের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে যে সপ্তাহব্যাপী লড়াই করতে হলো, সেটাও লজ্জায় ফেলেছে তাদের।

ফিলিপাইনের এই গোষ্ঠীর নাম মাউতে। যারা ‘আইএস রানাও’ নামেও পরিচিত। গোষ্ঠীটি ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অনুসারী হিসেবে নিজেদের ঘোষণা করে। মধ্যপ্রাচ্যের আইএস সমর্থকদের সঙ্গে এদের যেমন ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তেমনি ঘনিষ্ঠতা রয়েছে প্রতিবেশী মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও। আর ফিলিপাইনের অভ্যন্তরীণ ইসলামি কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও তাদের দারুণ বোঝাপড়া রয়েছে।

মাউতে গোষ্ঠীটি পাঁচ কিংবা ছয় বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল্লাহ মাউতে ও তাঁর ভাই ওমর মাউতে। তাঁরা ফিলিপাইনের লানাও দেল সুর প্রদেশের অধিবাসী। দুজনই মধ্যপ্রাচ্যে পড়াশোনা করেছেন। ওমর মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ও আবদুল্লাহ জর্ডানে পড়াশোনা করেছেন। তাঁরা আরবি ভাষায় কথা বলেন। দুজনই সালাফি ও জিহাদি মতাদর্শে প্রবলভাবে দীক্ষিত। কট্টর ইসলামপন্থী এই দুই ভাইয়ের মধ্যে ওমর ইতিমধ্যে সেনা অভিযানে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক আইএস সমর্থকের সঙ্গে মাউতে গোষ্ঠীর যোগাযোগ আছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। ফিলিপাইনের আরেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) নেতাদের সঙ্গে মাউতে গোষ্ঠীর বেশ ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ঘনিষ্ঠতা রয়েছে আবু সায়াফ জঙ্গিগোষ্ঠীর নেতা ইসনিলন হাপিলনের সঙ্গেও। এই হাপিলন ফিলিপাইনে আইএসের অঘোষিত ‘আমির’ বলে পরিচিত। তবে সম্প্রতি মাউতে গোষ্ঠীর উত্থান জঙ্গিগোষ্ঠী আবু সায়াফকে যেন কিছুটা পিছিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার সুপরিচিত উগ্রপন্থী সানুসির সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ২০১২ মারাওয়ির মিন্দানাও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পুলিশের হাতে সানুসি নিহত হন। মাউতে গোষ্ঠীর কয়েক শ সদস্য রয়েছেন বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। এই সদস্যদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছে।

মাউতে গোষ্ঠীটি খুব সম্ভবত ২০১৩ সালে মিন্দানাওয়ে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে। তবে তারা সবার নজরে আসে গত বছরের আগস্টে মারাওয়ির একটি কারাগারে ভেঙে ২৩ জন বন্দীকে মুক্ত করে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এরপর গত বছরেই সেপ্টেম্বর মাসে ফিলপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের জন্মশহর দাভাওয়ে বোমা হামলা চালিয়ে ১৪ জনকে হত্যা করে।

গত বছরের শেষের দিকে মাউতে বিদ্রোহীরা বুটিগ শহর দখল করে নেয়। পরে সরকার সেটার নিয়ন্ত্রণ নিলেও গত জানুয়ারিতেও আবার শহরটি দখল করে তারা। অনেক জীবনহানি ও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার পরও গোষ্ঠীটি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

মুসলমানদের পবিত্র মাস রমজান সামনে রেখে মাউতে গোষ্ঠী এবার মারাওয়ি শহর দখলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এটা মাউতের উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ দেয়।
জাকার্তাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যানালাইসিস অব কনফ্লিক্টের প্রধান সিডনি জোনস বলেন, মাউতের সঙ্গে বিদেশি যোগসাজশ রয়েছে। বিদেশ থেকে সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া থেকে তারা অর্থ পাচ্ছে। ফিলিপাইনের বর্তমান সরকার মাউতে গোষ্ঠীর শক্তিকে এই মুহূর্তে খাটো করে দেখছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইসলামি চরমপন্থাবিষয়ক বিশ্লেষক সিডনি জোনস বলেন, ইরাক-সিরিয়ায় পিছু হটতে থাকা আইএসে ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার অনেক নাগরিক রয়েছে। ইরাক-সিরিয়ায় টিকতে না পারলে তারা দেশে ফিরবে। তখন তারা মাউতের নেতৃত্বে এই অঞ্চলকে জিহাদের উর্বর ক্ষেত্র বানানোর সুযোগ নেবে।

বিবিসি অবলম্বনে লুৎফরজামান

Related Articles