আজ খন্দকার আব্দুল বাতেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

নিজস্ব প্রতিবেদক

আজ ২১ জানুয়ারি। গত বছরের এই দিনে  টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সাবেক সাংসদ ও মুক্তিযুদ্ধে গুনরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বাতেন বাহিনীর প্রধান খন্ধকার আব্দুল বাতেন মারা যান। দেলদুয়ার-নাগরপুরের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তাকে স্মরণ করছে।

তার জীবনি :

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার মোকনা ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী কোনড়া গ্রামে ১৯৪৫ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পারিবারে মরহুম খন্দকার আবদুল বাতেন জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মরহুম সিরাজুল ইসলাম ও মাতা : মরহুমা হাজেরা খাতুন । খন্দকার আবদুল বাতেন শৈশবে গ্রামের পাঠশালায় লেখা পড়া শেষ করে ১৯৬২ সনে পার্শ্ববর্তী লাউহাটী আজাহার মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ ও করটিয়া সা‘দত কলেজ হতে এইচ এস সি পাশ করেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ছাত্র নেতৃত্ব প্রদান করে আসছিলেন। সা‘দত কলেজে ছাত্র থাকা কালীন তিনি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন ।

তিনি ১৯৬৮-১৯৬৯ সনে জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি, ১৯৬৯-১৯৭০সনে সা‘দত কলেজ করটিয়ার ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯-৭০সনে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগ এর সহ-সভাপতি ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ টাঙ্গাইলের আহবায়ক নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজ নামে ( বাতেন বাহিনী ) বাহিনী গঠন করে অত্যান্ত বীরত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেন । বাতেন বাহিনী হানাদার বাহিনীর সাথে বহু যুদ্ধে অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যক হানাদার সৈন্য ও তাদের সহযোগীদের নিধন করে। তার বাহিনীর যুদ্ধ ক্ষেত্র – টাঙ্গাইল সহ ঢাকা জেলার কিছু অংশ , গাজীপুর জেলার কিছু অংশ , মানিকগঞ্জ জেলা এবং পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ব্যাপক অংশ। মুক্তিযুদ্ধে বেসামরিক পর্যায়ে গঠিত চারটি বাহিনীর মধ্যে ( কাদেরিয়া বাহিনী , বাতেন বাহিনী, হেমায়েত বাহিনী ও রফিক বাহিনীর) বাতেন বাহিনী অন্যতম । মুক্তি যুদ্ধে অনেকেই কৃতিত্বের কারনে খেতাব পেলেও , অনন্য অবদান ও কৃতিত্ব থাকা সত্বেও তিনি ও তার বাহিনীর কেও খেতাব প্রাপ্ত হন নাই। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি অতিসাধারন জীবন যাপন করেন। তিনি ছিলেন প্রচার বিমুখ একজন দেশ প্রেমিক রাজনীতিবিদ । তিনি ক্রীড়া অনুরাগী , নাট্যকার ও সাহিত্য ক্ষেত্রে অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন ।

তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরন সহ নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হন। তার প্রতিভা বিকাশে অর্থনৈতিক দৈন্যতাই প্রধান বাধা ছিল। খন্দকার আবদুল বাতেন এমন একজন ব্যাক্তি, রাজনীতিতে যাকে পারিবারিক ভাবে, অর্থনৈতিক ভাবে সহযোগিতা করা দুরে থাক, তাকে বিপদ জনক ভাবা হত। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নবগঠিত জাসদ এর কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি সারা দেশ চষে বেড়ান । তিনি সত্যিকারে রাজনৈতিক আদর্শে কর্মী তৈরী ও জনমত সৃষ্টির অনন্য কারিগর ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সততা ও দৃঢ় নেতৃত্বে টাঙ্গাইলের অধিকাংশ, বিশেষ করে নাগরপুরে কোন রাজনৈতিক দলই ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তাকে রাজনৈতিক ভাবে পিছনে ফেলতে পারে নাই। সা‘দত কলেজের ভিপি থাকাকালীন সময় থেকেই টাঙ্গাইলের এক শ্রেনীর রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যাতে খন্দকার আবদুল বাতেন তার প্রতিভা বিকাশ করতে না পারে তার জন্য সকল চেষ্টাই করেছেন। এতদসত্যেও ৭৯ সনে জেলা থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে, জামিনে থাকা অবস্থায় নির্বাচনের দুইদিন পূর্বে প্রতিপক্ষ ষড়যন্ত্র করে পকেট মারার মামলায় গ্রেফতার করাইয়ে নির্বাচনে পরাজিত করে।

৮৪-৮৫সনে তিনি নাগরপুর বাসীর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান থাকা কালীন ও তিনি অতিসাধারন জীবন যাপন করতেন । তার বাসার সকল দরজা সকল সময় নাগরপুর বসাীর জন্য উন্মুক্ত ছিল। ১৯৮৬ সনে জাসদ থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন কিন্তু একই কায়দায় প্রতিপক্ষ তাকে পরাজিত দেখান। ১৯৯১ সনে বিএনপি ও , আওয়ামীলীগের সাথে জাসদ থেকে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে, একই কায়দায় তাকে পরাজিত করা হয়। ২০০১ সনে তিনি আওয়ামীলগের প্রার্থী হন। দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী ও অভ্যন্তরীন কোন্দলে ১২০০ ভোটে তিনি বিএনপির কাছে পরাজিত হন। ২০০৮ সনে তিনি আওয়ামীলীগ থেকে নমিনেশন না পেয়ে নাগরপুর দেলদুয়ারের জনতার ভালবাসাকে সম্বল করে সতন্ত্র প্রার্থী (নিজের খেয়ে) হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ব্যাপক ভোটে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে আওয়ামীলীগে যোগ দেন।

খন্দকার আবদুল বাতেন আমাদের মাঝে নেই । তিনি রেখে গেছেন তার কর্ম। নাগরপুর দেলদুয়ার বাসী অবশ্যই স্বীকার করবেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সকল ক্ষেত্রে , তিনিই একমাত্র দৃশ্যমান জনহীতকর উন্নয়নের ছবি রেখে গেছেন। খন্দকার আবদুল বাতেন সব সময়ই সাধারন গরীব মেহনতী মানুষকে বেশী ভালবাসতেন । তাদের সাথে বেশী মিশতেন ,তাদের বেশি আদর করতেন ও কাছে টেনে বসাতেন এবং সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন ।

সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ সুজায়েত হোসেন বলেন, আমরা যারা ১৯৬৮-৬৯ থেকে তাকে জানি চিনি এবং মিশেছি এটা অন্তত বলতে পারি – সত্যিকারে তিনি একজন বড় মনের, বড় চিন্তার অধিকারী রাজনীতি বিদ ছিলেন । আমরা অনেকেই তাকে বুঝতে না পেরে অভিমান করেছি , দুঃখ দিয়েছি , আজ অনুভব করি দেশের মানুষের কল্যানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতির জনকের স্বপ্ন তারই কন্যার হাতে বাস্তবায়িত করার কাজে তার কাছ থেকে অনেক কিছু আমাদের শেখার ছিল। শাররীক ভাবে বাতেন ভাই আমাদের মাঝে নেই । কিন্তু তার কর্ম নাগরপুর -দেলদুয়ার বাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে – থাকবে।

(মজলুমের কণ্ঠ/২১জানুয়ারি/আর.কে)

সংবাদটি শেয়ার করুন

Related Articles